অস্ট্রিয়ায় ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের হিজাব নিষিদ্ধের পথে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১০৮ বার
স্কুলে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে অস্ট্রিয়া

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অস্ট্রিয়ায় ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের স্কুলে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার প্রস্তুতি নিয়েছে দেশটির সরকার। রক্ষণশীল নেতৃত্বাধীন এই সরকার এই বছরের শুরুতে এমন একটি বিল প্রস্তাব করেছিল, যা বৈষম্যমূলক এবং সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পারে বলে সমালোচনা করেছে বিভিন্ন অধিকার সংস্থা। খবর জানিয়েছে আল আরাবিয়া।

সরকারি যুক্তি অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ মূলত মেয়েদের ‘নিপীড়ন থেকে’ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে। অভিবাসী বিরোধী চাপের মধ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও এটি ইতিমধ্যেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েরা ইসলামিক রীতি অনুযায়ী হিজাব, বোরকা বা যে কোনো ধরনের পর্দা পরে স্কুলে আসতে পারবে না।

২০১৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধের একটি আইন অস্ট্রিয়ার সাংবিধানিক আদালত অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক হিসেবে বাতিল করেছিল। তবে সরকার আশা করছে, এবার প্রস্তাবিত আইনটির সাংবিধানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী। আইনটি পাস হলে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এটি কার্যকর হবে। ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ‘পরিচিতি পর্ব’ চালু করা হবে, যাতে নতুন নিয়মগুলি বোঝানো এবং ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথম পর্যায়ে নিয়ম লঙ্ঘন করলে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না, তবে নিয়মিত অমান্য করলে অভিভাবকদের ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।

অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী ক্লদিয়া প্লাকোল্ম আইনটি উপস্থাপনকালে বলেন, ‘যখন একটি মেয়েকে বলা হয় সে পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে ঢেকে রাখবে, তখন এটি কোনো ধর্মীয় রীতি নয়, বরং নিপীড়ন।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে সরকার তার নীতিগত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছে, তবে সমালোচকরা এটিকে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির নামে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য হিসেবে দেখছেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়া প্রস্তাবিত আইনকে ‘মুসলিম মেয়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বৈষম্য’ এবং ‘ইসলামবিরোধী বর্ণবাদের প্রকাশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই ধরনের আইন সামাজিক বিভাজন বাড়াবে এবং বৈষম্যকে বৈধতার ছাপ দেবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিজাব নিষিদ্ধের মতো নীতিমালা শিশুদের মানসিক স্বস্তি এবং শিক্ষাগত পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অস্ট্রিয়ার রক্ষণশীল সরকার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিবাসী বিরোধী জনগোষ্ঠীর সমর্থন শক্ত করতে চাইছে। সরকারের মতে, মেয়েদের হিজাব বাধ্যতামূলকভাবে পরতে বলা একটি সামাজিক চাপ এবং নিপীড়নের প্রতীক, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকা উচিত নয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকারকে হরণের চেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।

সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, এই আইন বাস্তবায়িত হলে মুসলিম শিক্ষার্থীরা আত্মসম্মানহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। শিশুদের স্বাধীনতা, ধর্মীয় চর্চা এবং শিক্ষা অধিকার সীমিত করার মতো পদক্ষেপ সমাজে বিভাজন ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে, তাদের পরিচয় ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, স্কুল শিক্ষার পরিবেশ এমন হতে হবে যেখানে শিশুরা নিরাপদ, সমান সুযোগ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় শিক্ষালাভ করতে পারে। হিজাব নিষিদ্ধের মতো আইন শিশুর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে হ্রাস করতে পারে, যা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

অস্ট্রিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিজাব নিয়ে এই বিতর্ক ইতিমধ্যেই উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু স্কুল শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। সরকারের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, নীতিটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং সংলাপ অত্যন্ত জরুরি।

সার্বিকভাবে বলা যায়, অস্ট্রিয়ার হিজাব নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবিত আইন কেবল একটি শিক্ষানীতি নয়, বরং ধর্ম, অধিকার এবং সামাজিক সমন্বয়কে কেন্দ্র করে বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মানবাধিকার প্রেক্ষাপটের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com