সর্বশেষ :
২০২৬ বিশ্বকাপে বড় পরিবর্তন, ফুটবল টুর্নামেন্টে নতুন যুগের ইঙ্গিত সোমালি রেফারিকে ঢুকতে না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনায় ইয়ান রাইট ২০২৬ বিশ্বকাপ: গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কারা এগিয়ে? মিরসরাইয়ে নিখোঁজ তিন কিশোর উদ্ধার, স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে মেলান্দহে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু চিরিরবন্দরে ৩ মাদকসেবীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারাদণ্ড ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার, বাজার স্থিতিশীলতায় উদ্যোগ প্রশাসনিক কাজে জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মে মাসে বিজিবির অভিযানে ১৭৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ, সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার ৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে নতুন বিতর্ক, যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে আলোচনা

সুদানে ড্রোন হামলায় প্রাণহানি, যুদ্ধের ছায়ায় এল-ওবেইদ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
সুদানে ড্রোন হামলায় প্রাণহানি, যুদ্ধের ছায়ায় এল-ওবেইদ

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুদানের উত্তর কোরদোফান প্রদেশের রাজধানী এল-ওবেইদ শহরে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় শিশুসহ অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর দেশটিতে চলমান সংঘাতকে আবারও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। সোমবার এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকা শহরটির বেসামরিক জনগণের জন্য এই হামলা নতুন করে আতঙ্ক, শোক ও অনিশ্চয়তার বার্তা বয়ে এনেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এল-ওবেইদের শহরকেন্দ্রের একটি আবাসিক এলাকায় ড্রোনটি আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ফোরণে ধসে পড়ে একটি বাড়ি। আশপাশের ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার সময় বাড়িটিতে নারী ও শিশুসহ একাধিক মানুষ অবস্থান করছিল। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আশপাশের সড়ক ও বসতবাড়ি। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলেও অনেককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

এই হামলার জন্য এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। তবে এল-ওবেইদ দীর্ঘদিন ধরে সুদানের সেনাবাহিনী ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। কয়েক মাস ধরে শহরটি ঘিরে রাখার চেষ্টা করছে আরএসএফ। ফলে এই হামলাকে চলমান যুদ্ধেরই একটি অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে সুদান কার্যত গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত। দেশটির সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়। রাজধানী খার্তুম থেকে শুরু করে দারফুর, কোরদোফানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। দুই পক্ষের লড়াইয়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা একে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করছে।

উত্তর কোরদোফান অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র এল-ওবেইদ শুধু একটি শহরই নয়, বরং সুদানের কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। এটি রাজধানী খার্তুমের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের দারফুর অঞ্চলের সংযোগকারী প্রধান সড়কপথে অবস্থিত। এই পথ নিয়ন্ত্রণে থাকলে দেশের মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা প্রভাবিত হয়। সে কারণেই এল-ওবেইদকে ঘিরে উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।

গত অক্টোবর মাসে দারফুর অঞ্চলে সেনাবাহিনী তাদের শেষ বড় অবস্থান হারানোর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। ওই সময় আরএসএফ দারফুরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে এবং এরপর কোরদোফান অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এল-ওবেইদসহ একাধিক শহর ঘিরে ফেলে তারা। স্থানীয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিত্রদের সহায়তায় আরএসএফ সেনাবাহিনী-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে চাপ বাড়াচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এল-ওবেইদে ড্রোন হামলায় নিহতদের মধ্যে শিশুর উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করছে, এই যুদ্ধে বেসামরিক মানুষই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে শহরটিতে নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, আবার অনেকেই যাওয়ার মতো জায়গা না পেয়ে ঝুঁকি নিয়েই শহরে অবস্থান করছে।

চিকিৎসা সূত্রগুলো বলছে, এল-ওবেইদের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এই অবস্থায় ড্রোন হামলার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

দক্ষিণ কোরদোফান অঞ্চল বর্তমানে সুদানের সংঘাতের অন্যতম তীব্র এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করেছে যে, এই অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ চরম খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না। আফ্রিকান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সহিংসতা কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং ড্রোন ও ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মতো ঘটনা সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এল-ওবেইদের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে ড্রোন হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংঘাত আরও দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমেই শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যার ফলে বেসামরিক প্রাণহানি বাড়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। শিশু ও নারীসহ সাধারণ মানুষ এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার।

এই হামলার পর এল-ওবেইদের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সামনে আরও বড় ধরনের হামলা হতে পারে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অন্তত বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

সুদানের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থীর চাপ বাড়ছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এল-ওবেইদের ড্রোন হামলা সেই বৃহত্তর সংকটেরই একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।

সব মিলিয়ে, উত্তর কোরদোফানের এই হামলা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, সুদানে শান্তি এখনও অনেক দূরের পথ। যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাবের আড়ালে প্রতিদিন নিঃশব্দে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষ। শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং তা একটি ভাঙাচোরা দেশের মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত