দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি: মা-ভাগ্নিসহ জাবি শিক্ষার্থী নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৫৪ বার
দৌলতদিয়া বাস দুর্ঘটনা জাবি শিক্ষার্থী

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় নতুন করে হৃদয়বিদারক এক ঘটনার উদ্ভব হয়েছে। একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আহনাফ রাইয়ান, তার মা এবং তার ছোট বোনের মেয়ে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন তার বোন চিকিৎসক ডা. নুসরাত জাহান খান সাবা, যিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা মুহূর্তেই পরিণত হয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস প্রায় ৫০ জন যাত্রী নিয়ে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এত দ্রুত ঘটনাটি ঘটে যে, অনেক যাত্রী নিজেদের রক্ষা করার সুযোগই পাননি। বাসটি নদীতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তলিয়ে যায়, আর শুরু হয় উদ্ধার অভিযানের এক দীর্ঘ ও কঠিন লড়াই।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় মানুষ, নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম দিকে কয়েকজন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও অনেকেই নিখোঁজ ছিলেন। সেই নিখোঁজদের তালিকায় ছিলেন আহনাফ রাইয়ান ও তার ভাগ্নি। প্রায় দশ ঘণ্টার উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার পর বৃহস্পতিবার ভোরে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল থেকে তাদের মরদেহ শনাক্ত করা হয়। এই খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই পরিবার ও স্বজনদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া।

আহনাফ রাইয়ানের মৃত্যুতে শুধু তার পরিবার নয়, বরং তার সহপাঠী ও সংগঠনের সদস্যদের মাঝেও গভীর শোক বিরাজ করছে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি রাজবাড়ী ডিবেট অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাবি রাজবাড়ী ছাত্রকল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তার সহপাঠীরা জানান, রাইয়ান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও সংগঠক হিসেবে দক্ষ একজন তরুণ, যার স্বপ্ন ছিল দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করা।

দুর্ঘটনায় তার মায়ের মৃত্যু এবং ভাগ্নির অকালপ্রয়াণ পুরো পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে। আহত অবস্থায় থাকা তার বোন ডা. নুসরাত জাহান খান সাবা বর্তমানে শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে এই শোক সামলানোর কঠিন সময় পার করছেন। একই সঙ্গে পরিবারটি হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে প্রিয় তিনজন সদস্যকে, যা এক অপূরণীয় ক্ষতি।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নিজ গ্রাম ভবানীপুরে আহনাফ রাইয়ানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে শেষ বিদায় জানানো হবে তাকে। ইতোমধ্যেই এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে, যেখানে সবাই এই তরুণের অকাল মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করছেন।

এদিকে দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে এবং নিখোঁজদের সন্ধানে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন, যাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই গুরুতর বলে জানা গেছে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, যার ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তবে সঠিক কারণ নির্ধারণে তদন্ত শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পেছনে কোনো গাফিলতি বা অবহেলা থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হওয়ায় এখানে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে তা যে কত বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি নির্মম উদাহরণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফেরিঘাটে যানবাহন ওঠানামার সময় আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, বরং পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি সম্ভাবনাময় তরুণের মৃত্যু, তার মায়ের অকালপ্রয়াণ এবং একটি শিশুর জীবনাবসান—সব মিলিয়ে এটি এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। এই শোক কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়, তবে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে এই প্রাণহানির প্রতি প্রকৃত সম্মান।

সব মিলিয়ে, দৌলতদিয়ার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—সড়ক ও নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কতটা প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত