নেপালে উত্তাপ, গ্রেফতার সাবেক প্রধানমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
  • ১৭ বার
নেপালে উত্তাপ, গ্রেফতার সাবেক প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৮ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপালের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নিয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী K. P. Sharma Oli-এর গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে। শনিবার (২৮ মার্চ) ভোরে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিজ বাসভবন থেকে তাকে আটক করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Ramesh Lekhak-কেও গ্রেফতার করা হয়েছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র একদিনের মধ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনা দেশটির ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) শপথ গ্রহণ করেন নতুন প্রধানমন্ত্রী Balen Shah, যিনি তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত। দায়িত্ব গ্রহণের ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে গ্রেফতারের ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তাপ দ্রুত বেড়েছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ওলির সরকারের পতন ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ, দুর্নীতির অভিযোগ, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরেই জমে ছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়ে বড় আন্দোলনের রূপ নেয়।

এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন জনপ্রিয় র‌্যাপ শিল্পী থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা Balen Shah, যিনি ইতোমধ্যে কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তরুণদের বড় একটি অংশ তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেন। আন্দোলনের সময় হাজার হাজার মানুষ রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসে এবং সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখরিত হয় দেশটির বিভিন্ন শহর।

প্রাথমিকভাবে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৯ থেকে ৩০ জন নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এই সহিংসতার পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকলে এক পর্যায়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওলি।

এরপর রাজনৈতিক সংকট নিরসনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি Sushila Karki-র নেতৃত্বে গঠিত ওই সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয় এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। সেই সরকারের তত্ত্বাবধানে গত ৫ মার্চ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি), যার নেতৃত্বে ছিলেন Balen Shah। পার্লামেন্টের ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দলটি। এর ফলে নেপালের ইতিহাসে অন্যতম কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। তরুণ নেতৃত্বের উত্থানকে দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেখককে গ্রেফতার করা হয়। কাঠমান্ডু ভ্যালি পুলিশের মুখপাত্র ওম অধিকারী আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানান, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাদের আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী K. P. Sharma Oli তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, নতুন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা করছে এবং তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। তার সমর্থকরাও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন এবং একে গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন।

তবে বর্তমান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Sudan Gurung জানিয়েছেন, এটি কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নয় বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেছেন, দেশের জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, এটি ন্যায়বিচারের সূচনা এবং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশটির গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ নেতৃত্বের উত্থান একদিকে নতুন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপ রাজনৈতিক বিভাজনও বাড়াতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নেপালের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নতুন সরকার যদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে, তবে তা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

তরুণদের প্রত্যাশা এখন নতুন সরকারের ওপর। দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কার— এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ কতটা আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ক্ষমতার পালাবদলের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্রেফতার হওয়া বিরল ঘটনা নয়, তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপালের জনগণ আশা করছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে সব পক্ষ সংযম দেখাবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত