প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানে চলমান সামরিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদি নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর সমাপ্তি ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ফ্রান্সে জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, ওয়াশিংটন মনে করছে ইরানে চলমান সামরিক অভিযান নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে এবং প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে দীর্ঘ সময় ধরে স্থলযুদ্ধে জড়ানোর প্রয়োজন না পড়ে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই অভিযানে স্থলবাহিনী মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং আকাশ ও নৌ শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে এবং অভিযানের সময়কাল মাসের পর মাস গড়াবে না বলেই যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল অন্যতম আলোচ্য বিষয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সংঘাতের বিস্তার রোধে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়।
যদিও স্থলবাহিনী ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করা হয়েছে, তবুও মার্কিন প্রশাসন প্রেসিডেন্টের জন্য সব ধরনের কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের কথা স্বীকার করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।
বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট Strait of Hormuz। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি এই প্রণালীতে টোল ব্যবস্থা চালু বা চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়, ফলে এই রুটে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংঘাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘটনায় কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। হামলায় কিছু সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। যদিও এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি, তবে ঘটনাটি আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
এর জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
এই সংঘাতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বাড়ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা দিচ্ছে না। তার মতে, ন্যাটোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয় বহন করা উচিত নয়।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং সমঝোতার পথে অগ্রসর হতে চাইছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে তেহরান কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, তারা কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত আরেকটি বিষয় হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে আলোচনায় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা Elon Musk-এর অংশগ্রহণের খবর। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্বনেতার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীদের সতর্কবার্তায়। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের পক্ষে নতুন কোনো দেশ যুদ্ধে যোগ দিলে তারা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইতোমধ্যে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি হরমুজ প্রণালীতে কিছু জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শত্রুপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা কয়েকটি জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান শেষ করা সম্ভব হবে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে উভয় পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়লেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করছে, দ্রুত উত্তেজনা কমিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।