প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার (২৭ মার্চ) হরমুজ প্রণালীকে ‘ট্রাম্প প্রণালী’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হইচই তৈরি করেছেন। মিয়ামিতে ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভে একটি ভাষণে তিনি বলেন, “ইরানকে ট্রাম্প প্রণালী—মানে, হরমুজ—খুলে দিতে হবে।” এই মন্তব্য শুনে উপস্থিত সাংবাদিক ও দর্শকরা রীতিমতো হাসির রোল ফেলেন।
বক্তৃতার পর তিনি ক্ষমা চাওয়ার ভানও করেন। বলেন, “ক্ষমা করবেন। আমি খুবই দুঃখিত। কী ভয়ানক একটা ভুল।” কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। “ভুয়া খবরগুলো বলবে, ‘তিনি ভুলবশত বলে ফেলেছেন’—না, আমার ক্ষেত্রে কোনো ভুল হয় না, খুব বেশি হয় না। যদি হতো, তাহলে এটা একটা বড় খবর হতো।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য তার স্বভাবসুলভ আত্মবিশ্বাস ও কখনো কখনো বিতর্কিত ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যের পরিচায়ক হিসেবে ধরা যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনার কারণে এই জলপথের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে সরবরাহিত মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। যুদ্ধ ও উত্তেজনার আগে এই নৌপথটি প্রায় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু ইরানের সামরিক কার্যক্রমের কারণে বর্তমানে এটি কার্যত অবরুদ্ধ।
ইরান জানিয়েছে, তারা এই প্রণালী খোলা রাখবে শুধুমাত্র তাদের সঙ্গে সম্পর্কহীন জাহাজের জন্য। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ কিছু ‘বন্ধুপ্রতীম দেশের’ জাহাজ চলাচলের অনুমতি ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। তবে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের মিত্রদের জাহাজ এই প্রণালী ব্যবহার করলে হামলা চালানো হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে ছয়টি জাহাজ ইরানের হামলার শিকার হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সফল হয়নি। ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌসেনার উপস্থিতি এবং স্থানীয় সামরিক নীতি প্রমাণ করছে যে, এই জলপথে কোনো বিদেশি শক্তি সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীকে নিজের নামে ‘ট্রাম্প প্রণালী’ নামকরণের কথা বিবেচনা করছেন। অথবা তিনি এটিকে ‘স্ট্রেইট অফ আমেরিকা’ বা ‘আমেরিকা প্রণালী’ বলে অভিহিত করতে চাইছেন। এর আগেও তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন, যা সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক কূটনীতির অংশ নয়; এতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রভাব প্রদর্শনের চেষ্টা স্পষ্ট। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে হাস্যরসের মতো দেখলেও এই ধরনের বক্তব্য বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও নৌপথ নিয়ন্ত্রণে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারও এই ঘটনার প্রভাবে সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ কঠোর হলে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র দেশগুলো এ নিয়ে কূটনৈতিক সমঝোতার পথও বিবেচনা করছে। তেহরান ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে, তাদের নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি রক্ষা করা তাদের অঙ্গীকারের অংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও হুঁশিয়ারি সমালোচনামূলক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যগুলো কখনো কখনো কৌতুকপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ বিশ্লেষণে বলা যায়, ট্রাম্পের মন্তব্যকে কেবল হাস্যরস হিসেবে দেখা হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক এবং জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে তা গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, আর এখানে যে কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠাপড়া এবং সরবরাহ বিঘ্ন ঘটাতে পারে।