অবিশ্বাসে আটকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫৩ বার
অবিশ্বাসে আটকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনীতিতে আবারও অনিশ্চয়তার ছায়া ঘন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও যুদ্ধ বন্ধের শর্তে একমত হতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। ফলে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা বারবার সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পথে বাধার মুখে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অচলাবস্থার মূল কারণ গভীর অবিশ্বাস, যা দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবিত করে আসছে।

বিশেষ করে এই অবিশ্বাসের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পারমাণবিক চুক্তি-এর দিকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে হওয়া এই চুক্তিটি সে সময় একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-এর প্রশাসনের উদ্যোগে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত রাখা এবং বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা।

তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তিটিকে “ত্রুটিপূর্ণ” হিসেবে উল্লেখ করে এবং নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই সিদ্ধান্ত ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে, যা আজও দুই দেশের সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

পরবর্তীতে জো বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসে চুক্তিটি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করলেও সেই প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। ইরান বারবার এমন নিশ্চয়তা দাবি করেছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন আবার একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করতে না পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোতে এমন স্থায়ী নিশ্চয়তা দেওয়া কার্যত অসম্ভব। ফলে আলোচনার টেবিলে শুরু থেকেই সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার ছায়া রয়ে গেছে।

এই অবিশ্বাস সাম্প্রতিক সময়েও আরও জোরালো হয়েছে। ইরান অভিযোগ করছে, কূটনৈতিক আলোচনার সময়ও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা আলোচনার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখছে না এবং গোপনীয়তা অবলম্বন করছে। এই পারস্পরিক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান অচলাবস্থার আরেকটি বড় কারণ হলো চুক্তির শর্ত নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য। সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে হবে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম মজুত কমাতে বা হস্তান্তর করতে হতে পারে। এটি ইরানের জন্য একটি বড় ও প্রায় অপরিবর্তনীয় ছাড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, এই ধরনের পদক্ষেপ তাদের কৌশলগত অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছাড় মূলত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। তবে এই ধরনের ছাড় তুলনামূলকভাবে পরিবর্তনযোগ্য এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তির ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে বলে মনে করা হয়। এই অসমতা আলোচনার অগ্রগতিতে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

তারপরও উভয় পক্ষই কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশই আলোচনার সুযোগ খোলা রাখছে। তবে একটি কার্যকর চুক্তি করতে হলে এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে কোনো পক্ষই একতরফাভাবে সুবিধা নিয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ পাবে না।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে এই সম্পর্কের প্রতিটি অগ্রগতি বা স্থবিরতা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকলেও তা ধীরগতির। উভয় পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙা না গেলে কোনো চুক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখনও সম্ভাবনার দোলাচলে রয়েছে। যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও পারস্পরিক আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরির বাস্তবসম্মত উদ্যোগও প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত