প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। হাসপাতালটিতে বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে প্রায় অর্ধশত শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই অল্প বয়সী শিশু এবং তাদের অনেকের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকায় জটিলতা দ্রুত বাড়ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মারা যাওয়া দুই শিশুর একজন গাজীপুর সদর এলাকার নয় মাস বয়সী রাইয়ান এবং অন্যজন শ্রীপুর উপজেলার পাঁচ মাস বয়সী মো. সিফাত। দুজনকেই জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট এবং তীব্র দুর্বলতার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের অবস্থার অবনতি হলে শেষ পর্যন্ত তারা মারা যায়।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিনুল ইসলাম সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে ৪৭ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড় বেড়েছে। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকদের কক্ষে ছুটছেন। কারও সন্তানের শরীরে লালচে দানা, কারও তীব্র জ্বর, আবার কেউ শ্বাসকষ্টে কষ্ট পাচ্ছে। শিশুদের কান্না আর অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা মিলিয়ে হাসপাতালের পরিবেশ হয়ে উঠেছে ভারী ও উদ্বেগপূর্ণ।
রাইয়ানের বাবা বলেন, কয়েকদিন ধরেই শিশুটির জ্বর ছিল। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়া হলেও পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয় এবং অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।
একই ধরনের বেদনার গল্প সিফাতের পরিবারেও। পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বরের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত শিশুদের মধ্যে এর সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। শুরুতে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদানে ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব হাম রোগের বিস্তারে অন্যতম কারণ। অনেক পরিবার এখনও শিশুদের নিয়মিত টিকা সম্পন্ন করেন না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং অবহেলা রয়েছে। ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। তবে কোনো কারণে টিকা বাদ পড়লে বা অসম্পূর্ণ থাকলে শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপও বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক অভিভাবক প্রথমদিকে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর ভেবে গুরুত্ব দেন না। এতে করে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম শুধু একটি সাধারণ ফুসকুড়ির রোগ নয়। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্বর ও শরীরে দানা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আক্রান্ত এলাকার পরিবারগুলোকে সচেতন করতে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদারের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এখন আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের ছোট শিশু রয়েছে, তারা বেশি উদ্বিগ্ন। অনেক অভিভাবক হাসপাতালে এসে শিশুদের পরীক্ষা করাচ্ছেন এবং টিকার তথ্য যাচাই করছেন।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি আক্রান্ত শিশু থেকে দ্রুত অন্য শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না, একইসঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের শতভাগ টিকার আওতায় আনা গেলে এ ধরনের মৃত্যু অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
দুই শিশুর মৃত্যু গাজীপুরের মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, হাম এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। সময়মতো সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।