কালীগঞ্জে রাকিবের মাচায় ঝুলছে বিদেশি আঙুর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৫৫ বার
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোমরাইল গ্রামে দর্শনার্থীদের নিজের বাগান ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন কলেজছাত্র রাকিব।

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্যে বদলে যাচ্ছে আঙুর চাষের ধারণা। শীতপ্রধান দেশের ফল হিসেবে পরিচিত আঙুর এখন বাংলাদেশের মাটিতেও সফলভাবে ফলন দিচ্ছে, আর সেই সাফল্যের গল্প লিখছেন কলেজছাত্র রাকিব হাসান।

কালীগঞ্জ উপজেলার গোমরাইল গ্রামে ১০ কাঠা জমির ওপর গড়ে তোলা আঙুর বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে রসে ভরা টসটসে আঙুর। মাচার নিচে সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা বিদেশি জাতের আঙুর দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার সরাসরি গাছ থেকে আঙুর কিনে নিচ্ছেন।

রাকিব হাসান মূলত কোটচাঁদপুর সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি কৃষিকে বেছে নিয়েছেন উদ্যোক্তা হিসেবে। ২০২৪ সালের মে মাসে তিনি রাশিয়ার উন্নত জাতের বাইকুনুর এবং ব্ল্যাক ম্যাজিক আঙুরের চারা রোপণ করেন। শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল পরীক্ষামূলকভাবে বিদেশি ফলকে দেশের মাটিতে সফলভাবে চাষ করা।

রাকিব জানান, প্রথম ধাপে তিনি ১২০টি চারা সংগ্রহ করেন। চারার দাম, মাচা তৈরি, নেটিং, সেচ ব্যবস্থা, সার ও কীটনাশক মিলিয়ে তার মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ টাকা। প্রথম বছরেই ফলন পেয়ে তিনি বাজারে আঙুর বিক্রি করেন প্রায় দুই লাখ টাকার। এতে খরচ বাদে এক লাখ টাকার মতো লাভ হয়, যা তাকে আরও উৎসাহিত করে।

চলতি বছর তার বাগান আরও সমৃদ্ধ ফলন দিয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম খরচে, প্রায় ১৫ হাজার টাকার নিয়মিত পরিচর্যায় তিনি এবার প্রায় তিন লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। এখনো বাগানে অনেক আঙুর ঝুলে রয়েছে, যা স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাকিব বলেন, একটি সুস্থ আঙুর গাছ থেকে সাধারণত ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। গাছ যত পরিণত হয়, উৎপাদনও তত বাড়ে। তার মতে, সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক পদ্ধতি জানা থাকলে আঙুর চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি কৃষি উদ্যোগ হতে পারে।

তার বাগানের সাফল্য এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই ভিডিও ও ছবি দেখে বাগান পরিদর্শনে আসছেন। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে বাগান ঘুরে দেখছেন এবং সরাসরি আঙুর কিনে নিচ্ছেন।

রাকিব আরও জানান, দর্শনার্থীদের আগ্রহের কারণে তিনি এখন আঙুরের পাশাপাশি চারা বিক্রির দিকেও মনোযোগ দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকার চারা বিক্রির অর্ডার পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

তার চাষ করা বাইকুনুর ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙুর মূলত বিচিহীন ও মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত। কিছু গাছে সামান্য বীজ থাকলেও তা পরবর্তীতে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে রাকিবের বার্তা, পরিকল্পিতভাবে কৃষিতে নামলে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অল্প খরচে বড় লাভ অর্জন সম্ভব। তার মতে, তরুণদের কৃষিকে পেশা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারাও রাকিবের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিব আলম রনি জানান, কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলে আঙুরসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে বিদেশি ফল যেমন আঙুর, ড্রাগন ফল ও স্ট্রবেরির মতো ফসলও বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে। রাকিবের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা সেই সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে আনছেন।

কালীগঞ্জের এই আঙুর বাগান এখন শুধু একটি কৃষি প্রকল্প নয়, বরং তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। রোদ-জলে বেড়ে ওঠা সেই সবুজ মাচার নিচে ঝুলে থাকা আঙুর এখন শুধু ফল নয়, একটি সম্ভাবনার গল্পও বটে—যা বলে দিচ্ছে, সঠিক উদ্যোগ থাকলে কৃষিতেই গড়ে উঠতে পারে স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com