সর্বশেষ :
আইপিএল ফাইনালে মুখোমুখি আরসিবি-গুজরাত পিএসজির শিরোপা অক্ষুণ্ণ, আর্সেনালের টাইব্রেকার দুঃখ ইরান যুদ্ধের সুবর্ণ সুযোগে তুরস্কে এরদোয়ানের ক্ষমতা সুসংহতকরণের গল্প চীনের আপত্তি উপেক্ষা করে সামরিক শক্তি বাড়ানোর ঘোষণা জাপানের ইউরোপসেরা পিএসজির শিরোপা উদযাপনে ফ্রান্সে রণক্ষেত্র দেশে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূলে কঠোর বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জামায়াত-এনসিপির অর্থের উৎস নিয়ে রাশেদ খাঁনের তীক্ষ্ণ কটাক্ষ ২৫ কোটি টাকা ‘নিয়ে যাওয়ার’ অভিযোগে মুখ খুললেন আসিফ মাহমুদ জেলা প্রশাসকের কাছে ১০ কোটি টাকার ব্যাখ্যা চাইলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ বিশ্বে বায়ুদূষণের শীর্ষে কিনসাসা, ঢাকার বাতাস এখনো অস্বাস্থ্যকর

সিনেমা থেকে রাজনীতি: বিজয়ের উত্থানের গল্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৩৮ বার
সিনেমা থেকে রাজনীতি: বিজয়ের উত্থানের গল্প

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বিজয়, যাকে ভক্তরা ‘থালাপাতি’ নামে চেনেন, তিনি এখন শুধুমাত্র পর্দার নায়ক নন—বাস্তব রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তামিল সিনেমায় তার দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা, সামাজিক বার্তাসমৃদ্ধ চরিত্র এবং বিশাল ভক্তগোষ্ঠী—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছেন, যা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য হলেও সুপরিকল্পিত।

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেছে। প্রাপ্ত আসনের হিসেবে দলটি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। তবে এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি কাঠামোবদ্ধ ও পরিকল্পিত সংগঠন।

বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রার প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল তার ভক্তদের মাধ্যমে। তামিলনাড়ু জুড়ে তার লাখো ভক্ত ‘রসিগার মণ্ডপ’ নামে সংগঠিত ছিল, যা মূলত চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক ফ্যান ক্লাব হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগঠনগুলো শুধুমাত্র সিনেমা প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠে—রক্তদান কর্মসূচি, ত্রাণ বিতরণ, শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের একটি সরাসরি ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ফ্যান ক্লাবের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং তারা কার্যকর সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়। এই নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে এমন এক শক্তিতে রূপ নেয়, যা ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। ফলে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই তারা মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং আস্থা অর্জন করে।

২০২১ সালে বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ না করেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালান। তার ফ্যান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেন। কোনো দলীয় প্রতীক বা বড় ধরনের প্রচারণা ছাড়াই প্রায় ১৬৯ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন, যার মধ্যে ১১৫ জন জয়লাভ করেন। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে বিজয়ের তৈরি নেটওয়ার্ক শুধু আবেগের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এবং কার্যকর।

এরপর আসে সংগঠনকে আরও সুসংহত করার ধাপ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বিজয়ের দল নতুন সদস্য বাড়ানোর দিকে না গিয়ে বিদ্যমান কাঠামোকে আরও দক্ষ করে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়। কর্পোরেট ধাঁচের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হয়। সাক্ষাৎকার, যাচাই-বাছাই এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে দলীয় কাঠামোকে আরও পেশাদার রূপ দেওয়া হয়। ফলে শুধুমাত্র ভক্ত হওয়ার ভিত্তিতে কেউ দায়িত্ব পায়নি; বরং যোগ্যতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রতীক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আর বিজয়ের দল এই জায়গাটিকেও কৌশলগতভাবে ব্যবহার করেছে। দলের প্রতীক ‘বাঁশি’ দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে শহর, ব্যানার থেকে সামাজিক মাধ্যমে—সবখানেই এই প্রতীক দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নারীরা তাদের বাড়ির সামনে বাঁশির আকৃতির আলপনা আঁকতে শুরু করলে এটি এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়, যা রাজনৈতিক সমর্থনের দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে কাজ করে।

এই পুরো প্রচারণার আড়ালে ছিল একটি সুসংগঠিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কগুলো প্রচারণার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে। স্বেচ্ছাসেবকরা মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালনা করেন—মানুষকে সংগঠিত করা, প্রচার সামগ্রী বিতরণ, সমাবেশ আয়োজন এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা। এই শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্রে পরিণত হয়।

বিজয়ের নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে একটি কার্যকর ফিডব্যাক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। মাঠপর্যায়ের তথ্য দ্রুত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছাত এবং সেখান থেকে নির্ধারিত বার্তা আবার নিচের স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান, জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি এবং তরুণদের আকৃষ্ট করার কৌশল—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে।

এই পুরো যাত্রায় বিজয়ের সমর্থকদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ও তৈরি হয়েছে, যাদের ‘অনিল’ নামে ডাকা হয়। এই শব্দটি তামিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘অনিল’ বা কাঠবিড়ালি প্রতীকটি এসেছে রামায়ণের সেই গল্প থেকে, যেখানে ছোট ছোট প্রাণীর অবদান মিলেই বড় কাজ সম্পন্ন হয়। বিজয়ের সমর্থকদের কাছে এটি ঐক্য, পরিশ্রম এবং সম্মিলিত শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তবে এই যাত্রা বাধাহীন ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো অনলাইনে এই ‘অনিল’ শব্দটিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নামটি নেতিবাচক অর্থ হারিয়ে সমর্থকদের গর্বের পরিচয়ে পরিণত হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের এই উত্থান একটি নতুন ধরনের রাজনীতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে জনপ্রিয়তা, সামাজিক কাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংগঠন একসঙ্গে কাজ করছে। এটি শুধুমাত্র একজন চলচ্চিত্র তারকার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্প নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক আন্দোলনের পরিণতি।

এখন প্রশ্ন একটাই—এই গতি ধরে রেখে বিজয় কি সত্যিই তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসতে পারবেন? যদি তা হয়, তাহলে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। তবে তার এ পর্যন্ত যাত্রা দেখে অনেকেই মনে করছেন, তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত।

সবশেষে বলা যায়, সিনেমার পর্দায় যে নায়ক ন্যায় ও নীতির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, বাস্তব রাজনীতিতেও সেই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে এক নতুন ইতিহাস গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন থালাপাতি বিজয়। তার এই যাত্রা শুধু তামিলনাড়ু নয়, বরং পুরো ভারতীয় রাজনীতির জন্য একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত