টানা বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারে বোরো ধান নষ্ট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
টানা বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারে বোরো ধান নষ্ট

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মৌলভীবাজার জেলা-এ বোরো ধান চাষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। জেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গিয়ে অন্তত ২ হাজার ৪৪২ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজারে মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং হাওরবহির্ভূত এলাকায় ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমি রয়েছে। কিন্তু আকস্মিক টানা বৃষ্টি ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার কারণে হাওর অঞ্চলের বড় অংশই এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, হাওরের নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যাওয়ায় এখনো ধান সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে ধানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, কারণ অনেক জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে থাকায় পচন শুরু হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। বাবর মিয়া নামের এক কৃষক জানান, আগে যেখানে তারা আধুনিক কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে দ্রুত ধান কাটতে পারতেন, এখন সেখানে বাধ্য হয়ে পানির নিচ থেকে ধান কাটতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচে। তার ভাষায়, “চার হাজার টাকা বিঘা প্রতি খরচ করে ধান তুলতে হচ্ছে, কিন্তু সেই ধান অনেক ক্ষেত্রেই পচে যাচ্ছে। গত বছর এমন পরিস্থিতি ছিল না, এবার সবকিছু বদলে গেছে।”

অন্যদিকে জুনেদ মিয়া নামের আরেক কৃষক জানান, তার ১৫ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র দুই বিঘার ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি জমির ধান এক থেকে দেড় ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় ফসলের বড় অংশই হয়তো আর ব্যবহারযোগ্য থাকবে না।

কৃষকরা আরও জানান, মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম কিছুটা ভালো থাকলেও এখন বাজারে ধানের দাম ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতি মণ ধান ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা কমে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে একদিকে ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারমূল্যও কমে যাওয়ায় দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।

কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, শুরুতে কিছু ধান ভালো দামে বিক্রি করলেও এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মতে, উৎপাদন খরচের তুলনায় বর্তমান বাজারমূল্য অনেক কম হওয়ায় কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জলাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে হাওর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কিছু এলাকায় পানি নামার স্বাভাবিক পথ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে জমিতে পানি জমে থাকছে, যা ধানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রকৃত পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, কারণ এখনো অনেক এলাকা পানির নিচে রয়েছে এবং সম্পূর্ণ মূল্যায়ন শেষ হয়নি। প্রাথমিকভাবে যে ৫০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট প্রভাব। অনিয়মিত বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং আর্থিক সহায়তার দাবি উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ে। অনেক কৃষকই এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। তারা সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তা এবং কৃষিঋণ পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের বোরো ধান উৎপাদনে এই ক্ষতি শুধু একটি জেলার কৃষি অর্থনীতির জন্য নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, দ্রুত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত