প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। মেট্রোরেল, গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন—বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জাইকার ঋণ ও কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে চলা স্বল্পসুদের সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসায় এখন নতুন করে ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, জাইকার অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) ঋণের সুদের হার সম্প্রতি বাড়িয়ে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে ঋণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে পরামর্শক খাতে ব্যবহৃত ঋণের সুদহারও ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগে ছিল শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এক সময় অত্যন্ত কম সুদে পাওয়া এই ঋণ বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় সহায়ক ছিল। ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। পরবর্তীতে ২০২২ সাল পর্যন্ত তা ধাপে ধাপে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দেশের অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তনের কারণে সেই সুবিধা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে অগ্রগতির কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণের শর্ত কঠোর করছে। এর ফলে শুধু জাইকা নয়, অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ঋণদাতারাও ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক সুদের দিকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিবর্তনের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশই এখন আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারভিত্তিক সুদের হার পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থায় বড় রূপান্তর ঘটেছে। বর্তমানে সোফর (SOFR) রেট ভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় গড়ে সুদের হার ৫ শতাংশের ওপরে চলে গেছে, যা আগের লাইবর (LIBOR) ভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
ইআরডির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই বাজারভিত্তিক ঋণের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। তখন সরকারের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি ছিল উচ্চ সুদের বাজারভিত্তিক ঋণ। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী অর্থবছরে এই হার আরও বাড়তে পারে এবং মোট বৈদেশিক ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
জাইকার ঋণ এখনও তুলনামূলকভাবে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ঋণের তুলনায় কম ব্যয়বহুল হলেও আগের মতো অত্যন্ত সাশ্রয়ী নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে জাইকার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তারা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রেই সুদের হার পুনর্বিন্যাস করছে। বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাইকার ভূমিকা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে বড় ধরনের অর্থায়ন করেছে। এসব প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইআরডি সূত্রে আরও জানা গেছে, জাইকা বর্তমানে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই অর্থ জ্বালানি আমদানি, সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় এবং অন্যান্য জরুরি সরকারি ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করা হবে। বিষয়টি চূড়ান্ত না হলেও আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেট সহায়তা এবং উন্নয়ন ঋণের ওপর নির্ভরতা যত বাড়বে, ততই ঋণ ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে। কারণ সুদের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাইকার ঋণ এখনও তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকলেও বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই সুবিধাও কমে আসতে পারে। তাই রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ এবং ঋণ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে জাইকার ঋণে সুদের হার ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে যেমন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে।