প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের হুনান প্রদেশে একটি আতশবাজি তৈরির কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ২১ জন নিহত এবং ৬১ জন আহত হয়েছেন। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং উদ্ধার তৎপরতা এখনও চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি এবং সিনহুয়ার বরাতে জানা যায়, সোমবার (৪ মে) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে এই বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে কারখানা এলাকা কেঁপে ওঠে এবং আগুন ও ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং অনেকে পালানোরও সুযোগ পাননি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, সবুজ পাহাড়ঘেরা এলাকায় পরিষ্কার আকাশের মধ্যে হঠাৎ করেই কালো ধোঁয়ার বিশাল স্তম্ভ উঠছে। কিছু ফুটেজে ধসে পড়া ভবন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা উদ্ধারকর্মীদের দৃশ্য দেখা গেছে। এসব দৃশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিস্ফোরণের পরপরই অন্তত পাঁচটি উদ্ধারকারী দল এবং তিনটি বিশেষায়িত উদ্ধার রোবট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। প্রায় ৫০০ সদস্যের একটি জরুরি উদ্ধার বাহিনী কাজ করছে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
চীনের হুনান প্রদেশ, যা Hunan Province, সেখানে শিল্প ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা রয়েছে। আতশবাজি ও বিস্ফোরক সামগ্রী উৎপাদন এই অঞ্চলে একটি পরিচিত শিল্প হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে অতীতেও একাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কারখানা চত্বরের ভেতরে থাকা দুটি বারুদ সংরক্ষণ গুদাম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে আগুন বা বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তিনি দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন আশপাশের এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ বিস্ফোরণের পর কিছু অংশে এখনও আগুন ও গ্যাসের ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানা এলাকার চারপাশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়েছে।
আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধ ও বিস্ফোরণজনিত আঘাত নিয়ে বহু রোগী ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে।
চীনে আতশবাজি ও বিস্ফোরক শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হলেও এটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হিসেবে পরিচিত। নিরাপত্তা বিধি না মানা বা অবহেলার কারণে অতীতেও দেশটিতে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকি না থাকলে ভবিষ্যতেও এমন দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারখানার কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, লাইসেন্সিং এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হবে।
আন্তর্জাতিক মহলও এই দুর্ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতশবাজি উৎপাদন কারখানাগুলোতে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যা হুনানের এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কারখানা এলাকায় ভিড় করছেন, অনেকেই এখনও নিখোঁজদের খোঁজে অপেক্ষা করছেন। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় কাজ করছে বলে জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, হুনান প্রদেশের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ চীনের শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।