রামিসা হত্যায় স্বামীর বিকৃতির ভয়ংকর তথ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ১১ বার
রামিসা হত্যায় স্বামীর বিকৃতির ভয়ংকর তথ্য

প্রকাশ: ২০ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর পল্লবী এলাকায় সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছোট্ট এক স্কুলছাত্রীর মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার, পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা পাওয়া এবং হত্যার পেছনে বিকৃত যৌন নির্যাতনের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন জনমনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানাকে ঘিরে আরও ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে তার স্ত্রী স্বপ্নার বক্তব্যে। পুলিশ জানিয়েছে, স্বপ্নার ভাষ্য অনুযায়ী জাকির ছিলেন বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি এবং তিনি নিজ স্ত্রীকেও দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করতেন।

মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় শিশু রামিসার মস্তকবিহীন দেহ। পরে একই ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় তার বিচ্ছিন্ন মাথা। এমন বিভৎস দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোক আর আতঙ্কের ছায়া।

নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার স্কুল–এর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পরিবারের আদরের এই শিশুকে প্রতিদিনের মতো সকালে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই পুরো পরিবারকে গ্রাস করে এক দুঃস্বপ্ন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে তার মা আশপাশে খোঁজ শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে মেয়ের স্যান্ডেল দেখতে পান তিনি। সন্দেহ হওয়ায় দরজায় বারবার কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে দীর্ঘ সময় পর দরজা খোলা হলে পরিস্থিতি আরও রহস্যজনক হয়ে ওঠে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সময়ের মধ্যেই ফ্ল্যাটের ভেতরে চলছিল ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড। পুলিশ ধারণা করছে, রামিসাকে প্রথমে যৌন নির্যাতনের শিকার করা হয়। পরে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ গুম এবং আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানার নাম। পেশায় তিনি ছিলেন রিকশা মেকানিক। ঘটনার পরপরই তিনি জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে পালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তারা জানতে পারে জাকির নারায়ণগঞ্জে একটি বিকাশের দোকানে টাকা তুলতে গেছে। পরে স্থানীয় পুলিশ ও দোকানদারের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে সেখান থেকেই তাকে আটক করা হয়।

মঙ্গলবার রাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা—শিশুটি বিকৃত যৌন আচরণ বা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তবে ময়নাতদন্ত ও কেমিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি বলেন, “রক্তক্ষরণ বা ঘটনা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় থেকেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পরে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়।”

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, রামিসার পরিবার ওই ভবনে প্রায় ১৭ বছর ধরে বসবাস করলেও অভিযুক্ত দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে সেখানে ভাড়া ওঠেন। স্থানীয়রা জানান, জাকির ও তার স্ত্রী স্বপ্না খুব বেশি মিশুক ছিলেন না। তবে তাদের আচরণ নিয়ে মাঝে মাঝে ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আলোচনা হতো।

পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের সময় স্বপ্নার ভূমিকাও সন্দেহজনক। রামিসার মা যখন দরজায় নক করছিলেন, তখন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দরজা খুলতে দেরি করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, মূল আসামি জাকিরকে পালানোর সুযোগ করে দিতেই তিনি সময়ক্ষেপণ করেছিলেন।

পরে জাকির জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর স্বপ্না দরজা খোলেন। এ কারণে পুলিশ মনে করছে, হত্যাকাণ্ডে তিনি সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন। ঘটনার পর ফ্ল্যাট থেকেই তাকে আটক করা হয়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না যে তথ্য দিয়েছেন, তা আরও উদ্বেগজনক। তার দাবি, জাকির দীর্ঘদিন ধরেই বিকৃত যৌনরুচির মানুষ ছিলেন এবং প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতেন। বিভিন্ন সময় অস্বাভাবিক আচরণ ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এই বক্তব্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জাকিরের অতীত কর্মকাণ্ড, তার মানসিক প্রবণতা এবং সম্ভাব্য অপরাধমূলক ইতিহাস এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে নাটোর–এ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলাও রয়েছে।

ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি ছোট্ট শিশুর সঙ্গে এমন নির্মমতা কোনোভাবেই কল্পনা করা যায় না। অনেকেই অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

শিশু অধিকারকর্মীরাও ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শহুরে জীবনে প্রতিবেশী সম্পর্কের দুর্বলতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে পরিচিত পরিবেশের ভেতরেই শিশুদের বড় ধরনের অপরাধের শিকার হওয়ার ঘটনা সমাজের জন্য ভয়াবহ বার্তা বহন করে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিকৃত যৌন আচরণ ও সহিংস প্রবণতা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে তা ভয়ংকর অপরাধে রূপ নিতে পারে। তাই পরিবার, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি জরুরি।

এদিকে রামিসার পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। যে শিশুটি সকালে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার নিথর দেহ উদ্ধার হয় পাশের ফ্ল্যাট থেকে। পরিবারের সদস্যরা বারবার প্রশ্ন তুলছেন—কীভাবে এত পরিচিত পরিবেশে এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তকারীরা বলছেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত এবং জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ঘটনার পূর্ণ বিবরণ বের করার চেষ্টা চলছে।

দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড আবারও শিশু নিরাপত্তা, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ছোট্ট রামিসার নির্মম মৃত্যু যেন সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত