ইরান যুদ্ধ থামাতে সিনেটে ট্রাম্পবিরোধী ভোট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
ইরান যুদ্ধ থামাতে সিনেটে ট্রাম্পবিরোধী ভোট

প্রকাশ: ২০ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প–এর ইরান নীতিকে ঘিরে এবার প্রকাশ্য বিভাজন দেখা দিয়েছে তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই। ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৮০ দিনের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাস হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ-ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব, যা কার্যকর হলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের পক্ষে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রস্তাব পাসে ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই ভোট দিয়েছেন চার রিপাবলিকান সিনেটর।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সিনেট ভোটে প্রস্তাবটি ৫০-৪৭ ভোটে পাস হয়। এতে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির চারজন সিনেটর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা হলেন র‍্যান্ড পল, সুসান কলিন্স, লিসা মুরকোস্কি এবং বিল ক্যাসিডি। অন্যদিকে, পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। আরও তিনজন রিপাবলিকান ভোটদানে অংশ নেননি।

ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় তার দলীয় সদস্যদের পক্ষ থেকে এমন প্রকাশ্য বিরোধিতা খুবই বিরল ঘটনা। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসের অবস্থান এতদিন রিপাবলিকানদের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে চার রিপাবলিকান সিনেটরের এই অবস্থানকে প্রেসিডেন্টের প্রতি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা শুরু করে। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি ছিল, ইরানের সামরিক তৎপরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য এই অভিযান প্রয়োজনীয় ছিল। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরে সমালোচনাও বাড়তে থাকে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে বেসামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েনও বেড়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি এবং যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যেও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সিনেটে উত্থাপিত হয় যুদ্ধ-ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব। মূলত মার্কিন সংবিধান ও ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট–এর আলোকে এই বিতর্ক সামনে আসে। ১৯৭৩ সালে প্রণীত ওই আইনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটানা ৬০ দিনের বেশি সময় বিদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন না।

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুক্তি দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৬০ দিনের সীমা গত ১ মে শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এখন কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন। অন্যথায় সামরিক অভিযান অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে হোয়াইট হাউস ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির কারণে ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর সময় গণনা থেমে যায়। ফলে প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো অন্তত আরও ৪০ দিন সময় রয়েছে, যার মধ্যে তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান চালাতে পারবেন।

এই সাংবিধানিক ব্যাখ্যা নিয়েই এখন ওয়াশিংটনে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। ট্রাম্পবিরোধীরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাহী ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন এবং কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প সমর্থকদের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

মঙ্গলবারের ভোটের পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে এই প্রস্তাব কার্যকর করা সহজ হবে না। কারণ, এটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে হলে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে সেই সমর্থন ডেমোক্র্যাটদের হাতে নেই। ফলে প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করতে বড় রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

তবুও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভোট প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখিয়েছে যে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের নিজ দলেও অস্বস্তি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রাণহানির কারণে রিপাবলিকানদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–এর মধ্যে নতুন প্রস্তাব বিনিময় চলছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চলতি সপ্তাহেই একটি সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অগ্রগতির ঘোষণা আসেনি।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সিনেটের এই ভোট হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ থামাবে না, তবে এটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও ভাঙন তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত