প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জমে ওঠা টেস্ট নাটকের শেষ অঙ্ক শুরু হওয়ার আগেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টি। পাঁচ দিনের উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ের শেষ দিনে যখন ক্রিকেটপ্রেমীরা অপেক্ষা করছিলেন এক রুদ্ধশ্বাস সমাপ্তির জন্য, ঠিক তখনই সকাল থেকে টানা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা। ফলে নির্ধারিত সময়ে খেলা শুরু হবে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল–এর মধ্যকার এই টেস্ট এখন এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ম্যাচের প্রতিটি বল বদলে দিতে পারে ফলাফল। জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন আর মাত্র ১২১ রান, অন্যদিকে বাংলাদেশের দরকার শেষ তিনটি উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে শেষ দিনের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছে উত্তেজনায় ভরপুর। কিন্তু প্রকৃতির অনিশ্চিত আচরণ সেই রোমাঞ্চে নতুন মোড় এনে দিয়েছে।
বুধবার সকাল থেকেই সিলেটের আকাশ ছিল মেঘলা। মাঝে মাঝেই নামছে হালকা বৃষ্টি। মাঠের কভার সরানো ও আবার ঢাকার দৃশ্য যেন চলছিল বারবার। মাঠকর্মীরা যত দ্রুত সম্ভব খেলা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু আবহাওয়ার ওপরই নির্ভর করছে সবকিছু।
তবে আবহাওয়া পূর্বাভাসে কিছুটা আশার কথাও রয়েছে। ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা খুব বেশি নেই বলেই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। গত কয়েকদিন ধরেই সিলেটের আবহাওয়া ছিল একই রকম—দিনভর মেঘলা আকাশ, আর বৃষ্টি মূলত রাতে। তাই ক্রিকেটপ্রেমীরা এখনো আশা ছাড়ছেন না যে দিনের কোনো এক সময় খেলা মাঠে গড়াবে।
এই টেস্ট ঘিরে নাটকীয়তা শুরু হয়েছিল ম্যাচ শুরুর আগেই। টানা বর্ষণে সিলেটের আউটফিল্ড ও উইকেট নিয়ে তৈরি হয়েছিল বড় শঙ্কা। এমনকি শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম–এ সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাও আলোচনায় আসে। তবে শেষ পর্যন্ত সিলেটেই ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় আয়োজকরা। এখন সেই সিদ্ধান্তেরই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা যেন নিচ্ছে প্রকৃতি।
চতুর্থ দিনের খেলা শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখনো বাংলাদেশের হাতেই আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, পাকিস্তানের হাতে রয়েছে মাত্র তিন উইকেট। তবে একইসঙ্গে পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় রানও খুব বেশি নয়। ফলে একদিকে বাংলাদেশের বোলারদের জন্য সুযোগ, অন্যদিকে পাকিস্তানের ব্যাটারদের জন্য ইতিহাস গড়ার হাতছানি।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসের লিডের ওপর ভর করে পাকিস্তানের সামনে ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য ছুড়ে দেয়। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এত বড় রান তাড়া করে জয়ের নজির খুবই কম। ফলে পাকিস্তানের সামনে ছিল প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চতুর্থ দিনের ব্যাটিং সেই অসম্ভব স্বপ্নকেও বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদ শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন। তার ৭১ রানের ইনিংস দলকে দৃঢ় ভিত এনে দেয়। এরপর বাবর আজম ৪৭ রান করে দলের রান তাড়াকে এগিয়ে নেন। যদিও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি তিনি, তবু তার ব্যাটিং পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
তবে পাকিস্তানের আসল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে সালমান আলী আগা ও মোহাম্মদ রিজওয়ান–এর জুটিতে। ষষ্ঠ উইকেটে এই দুই ব্যাটারের ১৩৪ রানের জুটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যখন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ সহজেই জয় তুলে নেবে, তখন এই জুটি পাকিস্তানকে আবারও ম্যাচে ফিরিয়ে আনে।
বিশেষ করে রিজওয়ানের ব্যাটিং ছিল দারুণ আত্মবিশ্বাসী। তিনি ধৈর্য ও আক্রমণের মিশেলে বাংলাদেশের বোলারদের চাপে ফেলেন। চতুর্থ দিনের খেলা শেষে ১৩৪ বলে ৭৫ রানে অপরাজিত আছেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটার। তার ব্যাটেই এখন পাকিস্তানের জয়ের স্বপ্ন টিকে আছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর ছিল তাইজুল ইসলাম–এর স্পিন জাদু। সালমান আলী আগাকে ফেরানোর পর দ্রুতই হাসান আলীকেও সাজঘরে পাঠান তিনি। ফলে ম্যাচ আবার বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।
বাংলাদেশি সমর্থকদের আশা, সকালে উইকেটে কিছুটা আর্দ্রতা থাকলে স্পিনাররা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। সিলেটের উইকেট পঞ্চম দিনে সাধারণত স্পিন সহায়ক হয়ে ওঠে। ফলে তাইজুল ও অন্য বোলারদের সামনে সুযোগ থাকবে দ্রুত ম্যাচ শেষ করার।
তবে সব হিসাব-নিকাশ এখন নির্ভর করছে বৃষ্টির ওপর। যদি দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকে, তাহলে ম্যাচ ড্রয়ের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। পাকিস্তানও চাইবে যতটা সম্ভব সময় নষ্ট হোক, যাতে ম্যাচ বাঁচানো সহজ হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইবে দ্রুত খেলা শুরু করে নতুন বল ও সতেজ বোলারদের কাজে লাগাতে।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেও তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক আবহ। সকাল থেকেই অনেক দর্শক মাঠের বাইরে অপেক্ষা করছেন। কারও হাতে বাংলাদেশের পতাকা, কেউ আবার পাকিস্তানের জার্সি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন শেষ দিনের উত্তেজনা উপভোগের আশায়। কিন্তু বৃষ্টি যেন তাদের ধৈর্যেরও পরীক্ষা নিচ্ছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই টেস্ট ইতোমধ্যেই সিরিজের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কারণ পাঁচ দিনজুড়ে ম্যাচে বারবার পাল্টেছে নিয়ন্ত্রণ। কখনো বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে, কখনো পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ফলে শেষ দিনের ফলাফল যাই হোক না কেন, এই টেস্ট স্মরণীয় হয়ে থাকবে নাটকীয়তার জন্য।
এখন প্রশ্ন একটাই—শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি কি ক্রিকেটকে সুযোগ দেবে? নাকি বৃষ্টিই কেড়ে নেবে বহু প্রতীক্ষিত এই রোমাঞ্চকর সমাপ্তি? সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় পুরো ক্রিকেটবিশ্ব।