প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে লেবানন এবং ইসরায়েলের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত। এই সংঘাত যখন বিশ্বজুড়ে এক নতুন সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার একটি উত্তপ্ত ফোনালাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। লেবাননে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং বৈরুতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের মিত্র নেতানিয়াহুকে তিনি ‘পাগল’ বলে অভিহিত করে তার অকৃতজ্ঞতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই ফোনালাপকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্কের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ কথোপকথনগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন, তখন তিনি তার রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তিনি সরাসরি নেতানিয়াহুকে মনে করিয়ে দেন যে, অতীতে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা চলার সময় তিনি কীভাবে তার পাশে থেকে তার রাজনৈতিক জীবন রক্ষা করেছিলেন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি যদি পাশে না দাঁড়াতেন তবে নেতানিয়াহুকে আজ কারাগারে থাকতে হতো। ট্রাম্পের এমন কঠোর বাক্যবাণ ছিল অনেকটা বিস্ফোরকের মতো, যেখানে তিনি নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি আস্ত একজন পাগল। আমি আপনার জীবন বাঁচাচ্ছি, অথচ আপনার কর্মকাণ্ডের কারণে এখন সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে। এই উত্তপ্ত ফোনালাপের মাধ্যমে ট্রাম্পের এই ক্ষোভের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তিনি আর ইসরায়েলের অনিয়ন্ত্রিত সামরিক আগ্রাসনকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নন।
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ট্রাম্পের এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা। ট্রাম্প মনে করেন, বৈরুতের মতো জনবহুল এলাকায় বোমা হামলা বা সামরিক অভিযান চালালে ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তিনি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকার করলেও, নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক কৌশলকে অদূরদর্শী এবং পরিস্থিতির জটিলতা বৃদ্ধিকারী বলে মনে করছেন। বিশেষ করে একজন হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে লক্ষ্য করে পুরো একটি ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ট্রাম্পকে মানসিকভাবে বেশ বিচলিত করেছে, যেখানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে চরম মাত্রায়। ট্রাম্পের মতে, নেতানিয়াহুর এই ধরনের হটকারী সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর মার্কিন প্রচেষ্টাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিতে পারে।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান গোপনীয় আলোচনা। ট্রাম্প যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কমাতে ইরানকে আলোচনার টেবিলে রাখার চেষ্টা করছেন, তখন লেবাননে নেতানিয়াহুর এই সামরিক তৎপরতা সেই প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ইরানের সাথে আলোচনা যাতে সফল হয়, সেজন্য ট্রাম্প চাইছেন এই অঞ্চলে উত্তেজনা কোনোভাবেই বাড়ানো না হোক। কিন্তু নেতানিয়াহু উল্টো পথে হেঁটে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান সম্প্রসারণ ও বৈরুতে হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছেন। ট্রাম্পের এই উদ্বিগ্ন হওয়ার পেছনে একদিকে যেমন মানবিক দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে তার নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে সফল করার রাজনৈতিক তাগিদ।
তবে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পরও নেতানিয়াহু তার অবস্থানে অটল থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপের পর তিনি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ যদি হামলা বন্ধ না করে, তবে ইসরায়েল বৈরুতের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। তার এই বিবৃতি প্রমাণ করে যে, আমেরিকার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ইসরায়েল তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়। যদিও পরবর্তীতে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, আপাতত বৈরুতে নতুন কোনো হামলার পরিকল্পনা তাদের নেই, তবে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন তিক্ত ফোনালাপ অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। ইরান ইস্যুতে তারা বহুবার একে অপরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করেছেন, কিন্তু এবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর গোঁয়ার্তুমির কারণে সম্পর্কের ফাটল অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে করা একটি পোস্ট থেকে বোঝা যায়, তিনি ইরানের সাথে আলোচনা ‘দ্রুত গতিতে চলছে’ বলে আশাবাদী, যা ইসরায়েলের যুদ্ধের উন্মাদনার বিপরীতে একটি নতুন মোড়। এখন দেখার বিষয় হলো, ট্রাম্পের কঠোর শাসানি নেতানিয়াহুকে সংযত করতে পারে কি না, নাকি লেবাননের আকাশ আবারও কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হতে চলেছে। পুরো বিশ্ব এখন এক উদ্বেগজনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দুই নেতার এই দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। শান্তির পথ আর যুদ্ধের সংঘাতের মাঝে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই যেন বিশ্ব এগোচ্ছে।