প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের টালমাটাল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্ব যখন এক নতুন সংকটময় মুহূর্ত পার করছে, তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যেকার ফোনালাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান টানাপোড়েন এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিরসনে এই দুই রাষ্ট্রপ্রধানের প্রায় ১৫ মিনিটের কথোপকথন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক নিয়ে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর এই সক্রিয় উদ্যোগ শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফোনালাপের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন—হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি গত কয়েক মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে, যা জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, সানায়ে তাকাইচি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অবাধ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এশীয় দেশগুলো, বিশেষ করে জাপানের মতো রাষ্ট্রগুলো, যারা তাদের তেলের চাহিদার বড় অংশই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে পূরণ করে, তারা এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ফলে চরম অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। পেট্রোলিয়াম উপজাত ন্যাপথার অভাব জাপানের প্যাকেজিং শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা প্রধানমন্ত্রী তার আলোচনায় তুলে ধরেন।
জাপান বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত নিরসনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে কথা বলছেন না, বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পক্ষে। ইরানের প্রেসিডেন্টের প্রতি তার আহ্বান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য তেহরান যেন সর্বোচ্চ নমনীয়তা প্রদর্শন করে। সানায়ে তাকাইচির এই বার্তাটি মূলত বিশ্বশান্তির বৃহত্তর স্বার্থে দেওয়া হয়েছে, যাতে যুদ্ধের দামামা স্তব্ধ হয়ে আলোচনার টেবিল পুনরায় সচল হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন যে, ইরান সরকার জাপানি জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি একইসঙ্গে মার্কিন নৌ নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি সামনে এনেছেন, যা তাদের জন্য বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জাপানের কাছে একটি গভীর কূটনৈতিক প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় জাপানি উন্নত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার বড় প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বিশেষ করে তেল শোধনাগার, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের অংশীদারিত্ব কামনা করেছেন। এছাড়া, বর্তমানে ইরানের মানুষ যেসব মানবিক সংকটের সম্মুখীন, বিশেষ করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি—তা নিরসনে তিনি টোকিওর মানবিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।
দুই নেতার এই টেলিফোন সংলাপটি যুদ্ধের আবহে একটি আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত এটি তাদের তৃতীয় টেলিফোন সংলাপ, যা প্রমাণ করে যে, সংকট সমাধানে দুই রাষ্ট্রপ্রধানই নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছেন। যদিও এর আগে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় খুব একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি, তবু জাপানের মতো একটি অর্থনৈতিক শক্তিশালীর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে ভিন্ন মোড় দিতে পারে। জাপান একদিকে যেমন ইরানের বন্ধুপ্রতিম দেশ, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের কৌশলগত গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে জাপান যদি কার্যকর কোনো প্রস্তাবনা তৈরি করতে পারে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় বিশাল অবদান রাখবে।
জাপানি জাহাজ ইদেমিৎসু কোসানের সাম্প্রতিক সফল যাত্রার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। ২৫ মে একটি তেল ট্যাংকার নিরাপদে জাপানে পৌঁছানোর ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে, কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে হলেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান ভবিষ্যতে আরও বেশি নমনীয় হবে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের প্রযুক্তি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা পূরণের বিষয়টি টোকিও কীভাবে দেখবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। জাপান সরকার যদি ইরানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখে, তবে তা তেহরানের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এই আহ্বান কেবল জাপানের জন্য প্রয়োজন নয়, এটি সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও অর্থনীতির জন্য অনিবার্য। তাকাইচি ও পেজেশকিয়ানের এই সংলাপ যেন কেবল কথার মালা না হয়ে ওঠে, বরং বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটে—এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্ববাসীর। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল পেরিয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতিপথ পুনরুদ্ধারে আজকের ফোনালাপ যদি একটি বড় সাফল্যের সূচনা করে, তবেই তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির পরিবর্তনের দিকে, যেখানে কূটনৈতিক বিচক্ষণতাই হতে পারে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।