সর্বশেষ :

যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে সরব মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেনবাউম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ১৩ বার
যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে সরব মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেনবাউম

প্রকাশ: ০২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মেক্সিকোর রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মেক্সিকোর স্থানীয় কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই অভিযোগ মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে। শেনবাউম মনে করেন, আদর্শিক বৈরিতা থেকেই মূলত এই উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঠিক প্রাক্কালে এমন গুরুতর অভিযোগ সরাসরি রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট শেনবাউমের এই অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত রোববার রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেক্সিকোর সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানা একটি অনভিপ্রেত এবং অগ্রহণযোগ্য বিষয়। তিনি স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তুলেছেন যে, মেক্সিকোর ভাগ্য বা সিদ্ধান্ত নির্ধারণের ক্ষমতা কি মেক্সিকোর জনগণের হাতে থাকবে, নাকি বাইরের কোনো বিদেশি শক্তি বা সংস্থার নির্দেশে তা নিয়ন্ত্রিত হবে। এই প্রশ্নটি তিনি মূলত দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেই তুলে ধরেছেন।

তবে এই সংকটের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি কোনো হাত আছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন শেনবাউম। সোমবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে, তিনি বিশ্বাস করেন না এই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। মূলত ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের সমীকরণ দ্রুত বদলেছে। বিশেষ করে শুল্ক নীতি এবং অভিবাসন সংক্রান্ত কঠিন বিধিনিষেধ মেক্সিকোর অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় দেশের নেতারা যখন একটি কাঠামোগত সমাধানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন পর্দার আড়ালে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর এমন তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্ককে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির মূল সূত্রপাত ঘটে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মেক্সিকোর ১০ জন উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ আনে। এই অভিযুক্ত তালিকায় মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন দল মোরেনার অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা এবং সিনালোয়া রাজ্যের গভর্নর রুবেন রোচাও রয়েছেন। এই ঘটনা মেক্সিকোর বর্তমান প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট শেনবাউম শুরু থেকেই এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, মেক্সিকোর কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি সুকৌশলী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন বিচার বিভাগ।

মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই উত্তেজনার প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। দেশটির কংগ্রেস সম্প্রতি একটি অত্যন্ত বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করেছে। এই সংশোধনী অনুযায়ী, যদি কোনো ধরনের বৈদেশিক হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায় তবে যে কোনো নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই আইনটিকে গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছে। তাদের অভিযোগ, এটি কেবল বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকাতে নয়, বরং নির্বাচনের ফল যদি ক্ষমতাসীন দলের মনমতো না হয় তবে তা বাতিল করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও সরকার দাবি করছে, এই আইনের লক্ষ্য কেবল জাতীয় স্বার্থ ও দেশের সংবিধান সুরক্ষিত রাখা।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট শেনবাউম অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মেক্সিকোর জাতীয়তাবাদী আবেগকে পুঁজি করছেন। এল ফিনান্সিয়েরোর সাম্প্রতিক একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মাঝেও ক্লদিয়া শেনবাউমের জনপ্রিয়তায় কোনো ভাটা পড়েনি। বর্তমানে তাঁর জনপ্রিয়তা ৬৯ শতাংশে অবস্থান করছে, যা মার্চ মাসের তুলনায় বেশ সন্তোষজনক। জনগণের কাছে তিনি একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যিনি বিদেশি শক্তির চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। মেক্সিকোর সাধারণ মানুষও তাদের নেত্রীর এই অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে।

সামগ্রিকভাবে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন আগামী দিনগুলোতে আরও প্রকট হতে পারে। একদিকে মেক্সিকো চাইছে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নীতিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে, অন্যদিকে মার্কিন উগ্র ডানপন্থী ও সরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন অজুহাতে মেক্সিকোর উপর চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শেনবাউমের সামনের দিনগুলোতে এই ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হবে অত্যন্ত কঠিন একটি পরীক্ষার সমতুল্য। বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি এখন এই ল্যাটিন আমেরিকার শক্তির দিকে, কারণ মেক্সিকোর অস্থিতিশীলতা পুরো উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তা ও বাণিজ্য ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা বনাম কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন শেনবাউম প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত