ভারতে দুই দিনে ভয়াবহ দুই অগ্নিকাণ্ড: প্রাণ গেল বহু মানুষের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ২১ বার
ভারতে দুই দিনে ভয়াবহ দুই অগ্নিকাণ্ড: প্রাণ গেল বহু মানুষের

প্রকাশ: ৪ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন বছরের শুরুতেই ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অগ্নিনির্বাপণ কাঠামোর চরম ব্যর্থতা যেন বারবার সামনে উঠে আসছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিহারের মুজাফফরপুর এবং ভারতের রাজধানী দিল্লির মালভিয়া নগরে ঘটে যাওয়া দুটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড গোটা ভারতকে শোকের সাগরে ভাসিয়েছে। একদিকে হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে আইসিইউ-এর অগ্নিকাণ্ডে অসহায় রোগীদের করুণ মৃত্যু, অন্যদিকে দিল্লির হোটেলে বিদেশি পর্যটকদের দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় প্রশাসন ও সুরক্ষা ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনার ঝড় বইছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর গাফিলতি যে সাধারণ মানুষের প্রাণের ঝুঁকি কতটা বাড়িয়ে দিয়েছে, এই দুটি ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

ঘটনাটির সূত্রপাত বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে বিহারের মুজাফফরপুর জেলা থেকে। প্রসাদ হাসপাতালের পঞ্চম তলায় যখন অধিকাংশ রোগী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই শর্ট সার্কিটের কারণে আইসিইউ ইউনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়। হাসপাতালের মতো একটি স্থানে যেখানে জীবন রক্ষার জন্য রোগীদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, সেখানে আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যেই গ্রাস করে সবকিছু। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আইসিইউ-এর জানালা দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশ কালো করে তুলেছিল। দমকল বাহিনী পৌঁছানোর আগেই আগুনের ভয়াবহ গ্রাসে চারজন রোগীর প্রাণহানি ঘটে। উদ্ধার তৎপরতা চালানো মুজাফফরপুর দমকল বিভাগের কর্মকর্তা রাম নিবাস পান্ডে জানিয়েছেন, তারা জীবন বাজি রেখে আইসিইউ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন রোগীকে উদ্ধার করেছেন। তবে বেঁচে যাওয়া রোগীদের শারীরিক অবস্থা নিয়েও শঙ্কা কাটছে না, কারণ ধোঁয়ার বিষক্রিয়ায় তাদের ফুসফুসের অবস্থা সংকটজনক। মুজাফফরপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত কুমার সেন জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় আইসিইউতে ১৩ জন এবং সিসিইউতে বেশ কয়েকজন রোগী ভর্তি ছিলেন। এই প্রাণহানি যে কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি, তা নিয়ে এখন স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন।

এই ঘটনার মাত্র একদিন আগেই দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগরের মিকাসা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ভারতের নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বুধবার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে হোটেলের বেজমেন্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হোটেলটির সরু গলি এবং অপরিকল্পিত কাঠামোর কারণে উদ্ধার কাজ চালানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। এই ঘটনায় ২১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই এখনো আশঙ্কাজনক। হোটেলটিতে প্রায় ৪০ জন অতিথি অবস্থান করছিলেন, যাদের বেশিরভাগই চিকিৎসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা বিদেশি নাগরিক। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অগ্নিকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আহত এই পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা বর্তমানে ম্যাক্স এবং সফদরজং হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। হোটেলটির বেজমেন্টে রেস্তোরাঁ পরিচালনার যে অনুমতি ছিল, তা কতটা বিধিসম্মত ছিল তা নিয়েও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ভারতের এই দুটি অগ্নিকাণ্ডেই সাধারণ মানুষের বাঁচার কোনো পথ ছিল না। আইসিইউ বা হোটেলের মতো পাবলিক প্লেসে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বিহারের হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটকে দায়ী করা হলেও হাসপাতালের অগ্নি-নিরাপত্তা লাইসেন্স এবং নিয়মিত ফায়ার অডিট সম্পন্ন ছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রবল সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক একইভাবে দিল্লির হোটেলটির বেজমেন্টে রেস্তোরাঁ পরিচালনা এবং অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের অপ্রতুলতা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ভিড়ে ভারত সরকার জীবন বাঁচানোর মৌলিক সুরক্ষা বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা করছে। একটি আধুনিক শহরে হাসপাতালের মতো জরুরি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অকেজো থাকা কিংবা হোটেলের মতো স্থানে জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় যোগ হচ্ছে না, বরং এটি প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। যারা প্রিয়জনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন বা যারা ভ্রমণের আনন্দ নিয়ে বিদেশে এসেছিলেন, তাদের এই করুণ পরিণতি ভারত সরকারের জন্য এক বিশাল কলঙ্ক হয়ে রইল। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। যদি হাসপাতালের আইসিইউই নিরাপদ না হয়, তবে সাধারণ নাগরিক কোথায় গিয়ে জীবনের সুরক্ষা খুঁজবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার তদন্তের আশ্বাস দিলেও দীর্ঘসূত্রতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। বিহার ও দিল্লির এই দুই ঘটনা এখন ভারতের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি এক কঠিন সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকে নাকি প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে নিরাপত্তা বিধিতে আমূল পরিবর্তন আনে। এ ধরনের ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের কঠোর নজরদারি এবং বেসরকারি স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপক মহড়া ও অডিট বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত