কর্ণফুলীতে নাশকতার ছক: ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে উসকানি, ছাত্রলীগের ১২ অনুসারী কারাগারে—ওসিকে ‘ঝুলিয়ে’ হত্যার হুমকি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৫ বার

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে আবারও ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব নতুন করে জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্লোগান ‘জয় বাংলা’ এবং ‘জয় বঙ্গবন্ধু’র অপব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে উসকানি ছড়ানোর সময় পুলিশের হাতে আটক হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ১২ সদস্য। পুলিশ জানায়, এই সদস্যরা সংঘবদ্ধ হয়ে নাশকতার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল এবং তাদের কর্মকাণ্ড ছিল সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শরীফ নিজেই দেশি-বিদেশি নাম্বার থেকে ভয়াবহ হত্যার হুমকি পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) মাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে।

সূত্র অনুযায়ী, শুক্রবার ২৫ জুলাই বিকেলে কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খোয়াজনগরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কালা মিয়ার দোকানের সামনে ১৪ জন যুবক একটি সংঘবদ্ধ অবস্থানে জড়ো হয়। তারা উচ্চস্বরে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে থাকে। সাধারণ চোখে দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ মনে হলেও পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়ে, এসব স্লোগানের আড়ালে তারা সামাজিক মাধ্যমে উগ্রবাদী ও রাজনৈতিকভাবে উসকানিমূলক বার্তা প্রচার করছিল। হামলাকারীরা স্লোগান দিতে দিতে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘জঙ্গি’ বলে আখ্যায়িত করে আক্রমণ চালায়, যা স্পষ্টতই বিদ্বেষমূলক এবং রাজনৈতিক প্ররোচনায় উৎসাহিত।

পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করে। অভিযুক্তরা হলেন—আশিকুল ইসলাম আকাশ, আকিফুল ইসলাম আকিব, আরাফাত হোসেন, আব্দুল করিম, আবু হাছনাইন বিজয়, আশরাফুল জামাল, সজিবুল ইসলাম ওরফে শরীফুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, মো. ইকবাল, আব্দুর রহমান ও ফোরকান। আটককৃতদের মধ্যে প্রায় সকলেই স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়শা খানের অনুসারী বলে দাবি করেছে পুলিশ।

ওসি মুহাম্মদ শরীফ জানান, “তথ্য ছিল যে ওরা নাশকতার পরিকল্পনায় ছিল এবং এসব ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করে তরুণ সমাজকে উসকে দিচ্ছিল। ভিডিওগুলোতে শুধু উত্তেজক স্লোগানই ছিল না, বরং রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন আক্রমণ এবং বিকৃত তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। তাদের মোবাইল ঘেঁটে পাওয়া গেছে এমন অনেক ভিডিও, যেগুলো সরাসরি গুজব, বিদ্বেষ ও সহিংসতা উসকে দেয়।”

এই অভিযানের পরই শুরু হয় আরেকটি ভয়ংকর অধ্যায়—ওসি মুহাম্মদ শরীফের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি। তিনি বলেন, “আমার মোবাইলে অন্তত ১০টি দেশি-বিদেশি নাম্বার থেকে ফোন আসে। আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘তোমাকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হবে’। আমাকে গালাগালও করা হয়। এটি নিছক উচ্ছৃঙ্খল আচরণ নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।” ওসি ইতিমধ্যে কর্ণফুলী থানায় এ বিষয়ে একটি জিডি করেছেন।

এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক মদত থাকার অভিযোগ নতুন নয়। ওসি শরীফ বলেন, “এই পুরো অপকর্মের পেছনে বড়সড় ছায়া রাজনীতি রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই কর্ণফুলীতে প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় ছিল। আমরা তাদের বারবার আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করেছি, কিন্তু রাজনৈতিক শেল্টার তাদের বারবার রক্ষা করেছে।”

এদিকে স্থানীয় সূত্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট অনুসারে, এই ১২ জনের বিরুদ্ধে আগেও একাধিকবার হুমকি, চাঁদাবাজি, মারধর ও সহিংসতা সংক্রান্ত অভিযোগ উঠেছিল, যদিও প্রতিবারই তারা রক্ষা পেয়ে যেত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়। এবার পুলিশের কঠোর অবস্থানে অবশেষে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়।

এই ঘটনায় কর্ণফুলীর সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “আমরা আতঙ্কে আছি। যারা ‘জয় বাংলা’ বলে নিজেদের পরিচয় দেয়, তারাই যদি গ্যাং চালায়, তাহলে জনগণ যাবে কোথায়?”

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা শুধুই একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কার্যক্রম নয়, বরং এটি বাংলাদেশে রাজনীতির নামে সহিংসতা, গুজব ও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের চিত্র প্রকাশ করে। দেশের রাজনীতিতে যখন পরিবর্তনের হাওয়া, তখন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে—পুরনো রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক অনৈতিকতার সংস্কৃতি এখনও নির্মূল হয়নি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ ধরনের রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ভিডিও ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়া বর্তমান সময়ের এক নতুন ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ—যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ওসি মুহাম্মদ শরীফ ও তার সহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। একইসঙ্গে এই ১২ গ্রেপ্তারকৃতের অতীত অপরাধ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণার বাস্তব ভিত্তিগুলো জনসমক্ষে আনার দাবি জানানো হচ্ছে। কারণ গণতন্ত্রের নামে নৈরাজ্য আর স্বাধীন মতপ্রকাশের আড়ালে উগ্রবাদ—এই দুইয়ের ব্যবধান স্পষ্ট করতে না পারলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অস্থির হয়ে উঠবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত