প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজনীতিতে গত কয়েক দিনে এক নতুন ও বিস্ময়কর সংযোজন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। বুধবার (৩ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটি তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং লড়াইয়ের রূপরেখা স্পষ্ট করেছে। এনইইটি (NEET), সিবিএসই (CBSE) এবং এসএসসিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের বিরুদ্ধে দলটি সরব হয়েছে। তারা সরাসরি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছে। তবে এটি কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং এটি ভারতের বেকার যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ, যা এখন একটি সুসংগঠিত আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দলের নবঘোষিত মুখপাত্র হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক সৌরভ দাস, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা বিজেতা দাহিয়া এবং সাবেক ম্যাকিন্সে কর্মী ও আম আদমি পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা। তাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল জবাবদিহিতা। সৌরভ দাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মাত্র দুজন কর্মকর্তাকে বদলি করে সরকার দায় এড়াতে পারবে না। আট লাখ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরিত পিটিশন থাকা সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রীর নীরবতা প্রমাণ করে যে সরকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা উদাসীন। তারা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং দায়িত্বশীলতার দাবি জানিয়েছেন। এই আন্দোলন কেবল অভিজিৎ দীপকে নামক এক ব্যক্তির নয়, এটি আজ ভারতের কোটি কোটি বেকার যুবকের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছে।
আগামী শনিবার (৬ জুন) দলটি রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে। তারা দিল্লি বিমানবন্দর থেকে পার্লামেন্ট স্ট্রিট পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলের পরিকল্পনা করেছে। এই মিছিলে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তিনি বোস্টন থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন এবং বিমানবন্দরে তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্ররা জানিয়েছেন, তারা জনতর মন্তরে প্রতিবাদ করার জন্য পুলিশের অনুমতি চাইবেন। তারা আশা করছেন, দিল্লি পুলিশ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে বড় মনের পরিচয় দেবে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে বাধা দেবে না।
এই আন্দোলনের নেপথ্যের গল্পটি বেশ নাটকীয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার যুবকদের একাংশকে ‘ককরোচ’ বা ‘পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সেই বিতর্কের সূত্র ধরেই অভিজিৎ দীপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা দেন। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অনলাইন উপস্থিতির তুলনায়ও অনেক বেশি। এই দ্রুত উত্থান প্রমাণ করে যে, ভারতের তরুণ প্রজন্ম চিরাচরিত রাজনীতির বাইরে এসে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নতুন কোনো প্লাটফর্ম খুঁজছিল, যা সিজেপি তাদের সামনে এনে দিয়েছে।
সিজেপি একটি ওয়েবসাইটও চালু করেছিল, যা সরকারের নির্দেশে কয়েক দিন পরই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের জবাবে অভিজিৎ দীপকে কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে উপহাস করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—‘তেলাপোকা দেখে তাদের এত ভয় কেন?’ তার এই ব্যঙ্গাত্মক অথচ শাণিত প্রশ্নটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। দলটির মুখপাত্র বিজেতা দাহিয়া জানিয়েছেন, এই আন্দোলন এখন কোনো নির্দিষ্ট নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি যুবকদের দল। তিনি জলবায়ু কর্মী সোনাম ওয়াংচুকের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দমন-পীড়ন দিয়ে সত্যকে চেপে রাখা সম্ভব নয়। কাউকে না কাউকে তো সত্যের পক্ষে এগিয়ে আসতেই হতো, আর সেই দায়িত্বটি এখন ভারতের তরুণরা কাঁধে তুলে নিয়েছে।
সিজেপির এই কার্যক্রম আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, তারা কেবলই একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা ভারতের সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সব নিয়ম মেনে প্রতিবাদ করাই তাদের লক্ষ্য। দলটির মুখপাত্ররা বিশ্বাস করেন, জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র এগোতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া মানে কেবল পরীক্ষার ফল বিপর্যয় নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর বছরের পর বছরের স্বপ্ন ও পরিশ্রমের মৃত্যু। এই মৃত্যুর বিচার চাইতেই সিজেপি রাজপথে নামছে।
আন্দোলনটি এখন কেবল দিল্লির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সারা ভারত থেকে মানুষ তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করছে। যারা এতদিন রাজনীতির ময়দানে কোণঠাসা ছিলেন, যারা পড়াশোনা শেষে চাকরির আশায় প্রহর গুণছেন, তাদের কাছে সিজেপি এক নতুন আশার নাম। তবে আন্দোলনটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু না করলেও, এর প্রভাব যে জাতীয় রাজনীতিতে বিশাল, তা বলাই বাহুল্য। বড় বড় দলগুলো যেখানে তথাকথিত ভোটব্যাংক নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে সিজেপি সরাসরি ছাত্র-শিক্ষক-বেকারদের ইস্যু নিয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছে।
আগামী ৬ জুনের কর্মসূচির দিকে তাকিয়ে আছে ভারত। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট স্ট্রিট পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি এই আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করে, তবে তা হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করলে সরকারও একটি গণতান্ত্রিক অবস্থানের পরিচয় দিতে পারে। ককরোচ জনতা পার্টির এই প্রথম সংবাদ সম্মেলন কেবল একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল না, এটি ছিল ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধে যুবসমাজের একটি সাহসী হুঙ্কার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই তরুণরা জেগে ওঠে, তখন যেকোনো পরিবর্তনের পালে হাওয়া লাগে। সিজেপি কি পারবে তাদের এই আন্দোলনকে সাফল্যের শেষ বিন্দুতে নিয়ে যেতে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন কেবল সময়ের অপেক্ষায়।
পরিশেষে, দেশের প্রতিটি তরুণ, যারা আজ সিজেপির ব্যানারে একত্রিত হয়েছে, তারা কেবল নিজেদের চাকরির দাবি জানাচ্ছে না; তারা চাচ্ছে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। যদি এই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তবে তা কেবল তাদের জয় হবে না, বরং তা হবে পুরো ভারতের ভবিষ্যতের জয়। ৬ জুনের রাজপথের এই প্রতিবাদ ভারতের আগামী দিনের রাজনীতিতে কোন পথে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।