প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। দীর্ঘ সময় ধরে রফতানি আয়ের শীর্ষে থাকা এই খাতটি বর্তমানে বিশ্ববাজারের জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কবলে পড়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাড়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, মে মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার আয় অর্জিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যার বিচ্যুতি নয়, বরং এটি দেশের হাজার হাজার কারখানার উৎপাদনশীলতা এবং ৪০ লাখেরও বেশি কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলার মতো একটি সূচক। উদ্যোক্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, যা সরাসরি আঘাত করেছে আমাদের পোশাক রফতানির ওপর।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এখন কিছুটা কোণঠাসা। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো তাদের উৎপাদন কৌশল, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং লজিস্টিক সাপোর্টে ব্যাপক পরিবর্তন এনে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হচ্ছে। তারা শুধু দামের ক্ষেত্রে নয়, বরং দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কেবল স্বল্প মূল্যের পোশাকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং আমাদের নীতি-কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিজিএমইএ নেতাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজস্ব নীতিতে বিশেষ ছাড় এখন সময়ের দাবি।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের প্রেসিডেন্ট এস এম আবু তৈয়ব এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান মন্দাভাব এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছেন। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা জটিলতা বাংলাদেশের পোশাক খাতকে বিশ্ববাজারে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণের ওপরও। অনেক ক্রেতাই বর্তমানে পণ্যের দাম কমিয়ে আনার জন্য কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মাঝে বিজিএমইএ নেতারা কিছুটা আশার আলো দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, আগামী তিন মাসে ক্রয়াদেশ আবারও বৃদ্ধি পাবে এবং রফতানির গতি প্রকৃতি স্বাভাবিক হবে। তবে এই প্রত্যাশার পেছনে প্রয়োজন সঠিক সরকারি উদ্যোগ এবং কার্যকর প্রণোদনা।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আগামী বাজেটে বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বারস্থ হয়েছেন। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো রফতানি আয়ের ওপর উৎসে কর কমিয়ে ০ দশমিক ৬৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এছাড়া এই করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করার আবেদনও জানানো হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তারা অন্য সব করের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। কর কাঠামোতে এই সহজীকরণ উদ্যোক্তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বড় ধরনের সহায়তা করবে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের প্রায় আড়াই হাজার কারখানায় কর্মরত ৪০ লাখ কর্মজীবীর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এই দাবিগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পোশাক খাতের এই অস্থিরতা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে শ্রমিকদের মধ্যেও। ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান যে খাতের ওপর দাঁড়িয়ে, তার সামান্যতম স্থবিরতাও সরাসরি শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলে। কারখানাগুলো যদি অর্ডারের অভাবে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, তবে তার খেসারত দিতে হয় নিম্ন আয়ের মানুষদের। তাই বিজিএমইএর এই প্রস্তাবগুলো কেবল ব্যবসায়ীদের মুনাফার জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার খাতিরে অত্যন্ত জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে গবেষণার পাশাপাশি নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে এখন ‘সবুজ কারখানা’ বা গ্রিন ফ্যাক্টরির দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনে আগ্রহী। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গ্রিন ফ্যাক্টরির মালিক দেশ হলেও, বর্তমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে হবে। পোশাক শিল্পের এই সংকটকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে আমরা যদি নীতি-কৌশলে আধুনিকায়ন আনতে পারি, তবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা অসম্ভব হবে না। সরকার যদি বাজেটে পোশাক শিল্পের জন্য সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে এই খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি অনেক গুণ বেড়ে যাবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে কেবল পণ্য রফতানি নয়, বরং উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়া, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পোশাক শিল্প আমাদের গর্ব, আর সেই গর্বের মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ী সমাজকে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে।