বাজেট সামনে রেখে আবাসন খাতে নতুন প্রস্তাব: কতটুকু যৌক্তিক?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ২৬ বার
বাজেট সামনে রেখে আবাসন খাতে নতুন প্রস্তাব: কতটুকু যৌক্তিক?

প্রকাশ:  ৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ‘নিজের একটি ফ্ল্যাট’ কেবল চার দেয়ালের একটি আস্তানা নয়, বরং এটি জীবনের চরম নিরাপত্তা এবং সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং নির্মাণ সামগ্রীর লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সেই স্বপ্ন আজ অনেকের জন্যই অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। রায়হান শরিফের মতো অসংখ্য মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমানো টাকা নিয়েও এক টুকরো ছাদের নিচে দাঁড়াতে পারছেন না। ঠিক এমন এক বাস্তবতায় আসছে জাতীয় বাজেটকে ঘিরে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব (রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) বেশ কিছু দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান হলো রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান। এই দাবিগুলো একদিকে যেমন আবাসন খাতের সংকট কাটাতে সহায়ক বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা দেখছেন এর ভিন্ন ও জটিল দিক।

আবাসন শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই সংকটের কথা বলে আসছেন। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু থেকে শুরু করে আমদানি করা ফিটিংস—প্রতিটি জিনিসের দাম গত কয়েক বছরে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সেই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা আমদানিকৃত সামগ্রীর ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাকের মতে, ঢাকা শহরে সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। আবাসন খাতের এই মন্দা কেবল ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ব্যাহত করছে না, বরং তা সাধারণ মানুষের আবাসন স্বপ্নকেও ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। গোল্ডস্যান্ডস গ্রুপের সিইও শাহাদাৎ হোসেন বাহারের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হোটেল নির্মাণ বা বড় প্রজেক্টের ক্ষেত্রে অন্তত নির্মাণ উপকরণের ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়া হলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।

সবচেয়ে বিতর্কিত দাবিটি হলো ‘কালো টাকা’ বা অপ্রদর্শিত আয় সাদা করার সুযোগ। রিহ্যাব নেতারা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, যদি এই সুযোগ দেওয়া হয়, তবে দেশের টাকা বিদেশে পাচার না হয়ে দেশীয় আবাসন খাতে বিনিয়োগ হবে। ড. মো. আলী আফজালের মতে, এমন সুযোগ না থাকলে টাকা পাচার হয়ে বিদেশের ‘বেগমপাড়ার’ মতো জায়গা গড়ে উঠবে। তারা মনে করছেন, একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে সরকার যেমন রাজস্ব পাবে, তেমনি খাতটিও গতিশীল হবে। তবে এই যুক্তির সাথে ভিন্নমত পোষণ করছেন অর্থনীতিবিদরা। সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খানের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে তা একদিকে যেমন সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে, অন্যদিকে এটি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য নষ্ট করে। তাদের মতে, অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগ না দিয়ে বরং কর ফাঁকি রোধে কাঠামোগত সংস্কার করা বেশি জরুরি।

নিবন্ধন ব্যয় বা রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানোর দাবিটি অবশ্য অধিকাংশেরই গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। বর্তমানে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ব্যয় অনেক বেশি হওয়ার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতারা ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দেখানোর প্রবণতায় লিপ্ত হন। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায় এবং পুরো আবাসন খাতের স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব হলো, ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্যের ওপর যুক্তিসঙ্গত কর আরোপ করা হোক এবং মৌজা ভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন খরচ কমিয়ে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করা হোক। যদি নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ ও সাশ্রয়ী হয়, তবে মানুষ ফ্ল্যাটের দাম নিয়ে লুকোচুরি করবে না এবং স্বচ্ছভাবে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেবে।

এই সমস্যার সমাধান কি কেবল প্রণোদনাতেই সীমাবদ্ধ? অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ হলো, নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং কর শনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) সাথে সরাসরি যুক্ত করা উচিত। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং কর ফাঁকির পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে যে লুকোচুরি চলছে, তা বন্ধ করতে পারলে আবাসন খাত যেমন তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে, তেমনি সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও ন্যায্যমূল্যে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ পাবে। একইসাথে পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে নিবন্ধন ব্যয় কমানো হলে সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে উঠবে, যা নতুন ফ্ল্যাটের ওপর চাপ কমিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য আবাসনের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

পরিশেষে বলা যায়, আবাসন খাত কেবল একটি ব্যবসা নয়, এটি বাংলাদেশের নগরায়ণ ও মানুষের জীবনযাত্রার মানের সাথে গভীরভাবে জড়িত। সরকার যখন বাজেট প্রণয়নের কাজে ব্যস্ত, তখন একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও নৈতিক অবস্থানকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত পথ না খুঁজে বরং কীভাবে কর কাঠামোকে সহজতর করা যায় এবং কীভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসন স্বপ্নকে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটিই হোক এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য। আবাসন খাতের মন্দা কাটাতে সাহসী ও সৃজনশীল উদ্যোগই পারে রায়হান শরিফদের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। মানুষের স্বপ্ন ও রাষ্ট্রের অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হোক আগামীর উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত