সড়কে চার প্রাণ ঝরল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়: স্বজনদের আহাজারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৩৫ বার
সড়কে চার প্রাণ ঝরল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়: স্বজনদের আহাজারি

প্রকাশ: ৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহাসড়কগুলো যেন আজ শোকের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। শুক্রবার ভোরের শান্ত প্রকৃতিকে ছিন্নভিন্ন করে দুটি আলাদা সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল চারটি তাজা প্রাণ। এক পরিবারের মা ও শিশুসন্তানসহ এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মহাসড়কে শৃঙ্খলাহীনতা, বেপরোয়া যান চলাচল এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের খেসারত দিতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারালেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ চারজন যাত্রী। সড়ক দুর্ঘটনার এই বিভীষিকা যেন থামছেই না, একের পর এক দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, মহাসড়কগুলো এখন আর নিরাপদ নয়, বরং তা পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।

ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে, যখন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাইল উপজেলার বাড়িউড়া নামক স্থানে প্রাইভেটকার ও অটোরিকশার সংঘর্ষে অলি মিয়া নামের এক ব্যক্তি নিহত হন এবং আরও চারজন আহত হন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একই জেলার পৌর এলাকার বিয়াল্লিশ্বরে ঘটে আরও ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। কসবা উপজেলার মূলগ্রাম থেকে অটোরিকশায় করে নরসিংদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন কাউসার আহমেদ তার স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে। পরিবারের আনন্দময় সেই যাত্রা যে মৃত্যুর পথে মোড় নেবে, তা কেউ ভাবেনি। পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাছবাহী দ্রুতগামী পিকআপ ভ্যান তাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে এমনভাবে চাপা দেয় যে, গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

দুর্ঘটনার মুহূর্তেই অটোরিকশার দক্ষ চালক মাহবুব আলম প্রাণ হারান। পরে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথে এবং সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাউসার আহমেদের স্ত্রী জোসনা আক্তার এবং তাদের আট বছরের শিশুপুত্র আশরাফুল মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। পরিবারের বাকি সদস্যরা—বাবা কাউসার আহমেদ এবং দুই শিশু কন্যাসন্তান আশা মনি ও আদিবা আক্তার—এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আহতদের আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একটি পরিবারের এমন নিমিষেই শেষ হয়ে যাওয়া মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করেছে পুরো গ্রামকে। শোকসন্তপ্ত স্বজনদের অভিযোগ, পিকআপ ভ্যানগুলোর চালকরা মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়, যেন তাদের থামানোর কেউ নেই।

মহাসড়কের এই ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের মতে, সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় না থাকা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়াই এ ধরনের মৃত্যুর মূল কারণ। হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম আরও বাড়ানো উচিত এবং মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত নজরদারি চালানো একান্ত প্রয়োজন। মাছবাহী বা মালবাহী পিকআপ ভ্যানগুলো যে গতিতে মহাসড়ক দখল করে রাখে, তা প্রতিনিয়ত সাধারণ অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির যাত্রীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কে নেবে এই জীবনের দায়ভার?

খাঁটিহাতা হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করা হয়েছে এবং চালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে কেবল গাড়ি জব্দ বা চালকের শাস্তিই কি জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে? প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পর আমরা একইভাবে শোক প্রকাশ করি, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরে না। স্বজনহারাদের চোখের পানি শুকানোর আগেই নতুন কোনো দুর্ঘটনা আমাদের দুয়ারে এসে কড়া নাড়ে। আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে চারজন মারা গেলেন, তাদের মধ্যে কেবল চালক নন, একটি পুরো পরিবারের স্বপ্নের সমাধি হয়েছে। শিশুপুত্র আশরাফুলের মৃত্যু কি কোনো বাবা-মা সহজে মেনে নিতে পারেন? জোসনা আক্তারের চলে যাওয়ার শূন্যতা কি আর কখনো পূরণ হবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি আইনি বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়। মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিটি চালকের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিয়াল্লিশ্বর বা সরাইলের বাড়িউড়া এলাকা আজ কান্নায় রত, কিন্তু আগামীতে যেন কোনো পরিবারকে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়, সেটাই হোক আমাদের মূল চাওয়া। প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন—সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করুন, যেন কোনো চালক আইন ভেঙে পার পেয়ে না যায়। আজকের এই চারজনের মৃত্যু আমাদের সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা প্রার্থনা করি, আহতরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরে আসে এবং নিহতদের পরিবার এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার শক্তি পায়। সড়ক হোক নিরাপদ, এটাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত