নতুন পে স্কেল: শতভাগ বাস্তবায়নের দাবি সরকারি কর্মচারীদের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ২ বার
নতুন পে স্কেল: শতভাগ বাস্তবায়নের দাবি সরকারি কর্মচারীদের

প্রকাশ: ০৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে জর্জরিত সরকারি চাকুরেদের পরিবারগুলোতে এখন একটাই আলোচনার বিষয়—নতুন বেতন কাঠামো কেমন হবে এবং কবে নাগাদ তা কার্যকর হবে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আবদুল মালেক সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান হতাশা কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে পে স্কেলের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন। তাদের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট—পে স্কেল যেন কোনো ধাপে বা খণ্ডিত আকারে নয়, বরং একবারে শতভাগ বাস্তবায়ন করা হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা কর্মচারীরা এখন সরকারের কাছ থেকে একটি চূড়ান্ত আশ্বাসের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

কর্মচারী নেতৃবৃন্দের আশঙ্কা, যদি পে স্কেল ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বারবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সুযোগ পেয়ে যাবে। তাদের মতে, এককালীন পূর্ণাঙ্গ পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে বাজারের ওপর সেই প্রভাবটি একবারই পড়বে, যা পরবর্তীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। এছাড়া, দেশের উন্নয়ন ও বাজেট প্রতিবছর হলেও পে স্কেল প্রতিবছর হয় না। তাই একটি যুগোপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রণয়ন করার জন্য সরকার চাইলে অন্য কোনো খাতের বরাদ্দ কিছুটা কাটছাঁট করেও প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিতে পারে বলে মনে করেন তারা। এতে সরকারের প্রতি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আস্থা ও নির্ভরশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে যেসব তথ্য শোনা যাচ্ছে, তা নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে একধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে। শোনা যাচ্ছে যে, নতুন বেতন কাঠামোটি হয়তো তিনটি অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাস থেকেই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেসিক বেতনের অর্ধেক অংশ পেতে শুরু করতে পারেন এবং পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অর্ধেক কার্যকর হতে পারে। এরপর ২০২৮-২০২৯ অর্থবছরে নতুন পে স্কেলের আওতায় নির্ধারিত অন্যান্য ভাতা ও সুবিধাগুলো ধাপে ধাপে চালু করার একটি রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কর্মচারীরা এই খণ্ডিত বাস্তবায়নের চেয়ে এককালীন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এতে করে একদিকে যেমন মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বারবার বেতন কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ থাকবে না।

আগামী ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সংসদে পেশ করবেন। এই বাজেট অধিবেশনেই পে স্কেলের বরাদ্দের বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত প্রকাশ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে ৩০ থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘থোক বরাদ্দ’ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যা পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করবে। নবম জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির যে প্রস্তাবটি এসেছে, তা বাস্তবায়িত হলে গ্রেড অনুযায়ী বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। প্রথম গ্রেড থেকে শুরু করে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই এর প্রভাব পড়বে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

বেতন কাঠামো ছাড়াও পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর রয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, মাসিক পেনশন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনভোগীদের জন্য ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ প্রবীণ পেনশনভোগীদের জন্য অত্যন্ত মানবিক ও স্বস্তিদায়ক। এছাড়া চিকিৎসাভাতা সংক্রান্ত প্রস্তাবটিও বেশ সময়োপযোগী। বর্তমানে ৮ হাজার টাকা চিকিৎসাভাতা পান ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীরা, যা বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসাথে ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসাভাতা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা অসুস্থ ও প্রবীণ কর্মচারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বড় ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।

সরকারি চাকরিজীবীরা রাষ্ট্রের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা সরকারের যেমন দায়িত্ব, তেমনি তাদের কাজের উৎসাহ ধরে রাখার জন্য একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামো থাকা অপরিহার্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রা যখন কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন তাদের প্রত্যাশাগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকার নিশ্চয়ই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং কর্মচারীদের আবেগ ও চাহিদার কথা ভেবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আগামী ১১ জুনের বাজেট ঘোষণার পর সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। পুরো দেশ তাকিয়ে আছে সেই দিনের দিকে, যেদিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পে স্কেলের সুসংবাদ জানাবে এবং কোটি সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়তে হলে কর্মচারীদের প্রাপ্য ও অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ ও দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত