প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ের আকাশ-বাতাস যেন গত কয়েক দিন ধরে ভারী হয়ে ছিল এক মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায়। হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় গত চার দিন ধরে আটকা পড়ে ছিল শিশুসহ মোট দশটি প্রাণ। তাদের অমানবিক অবস্থার খবর যখন প্রকাশ্যে এল, তখন বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে এক গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে বিজিবি’র কঠোর অবস্থানে নতি স্বীকার করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ওই ১০ জনকে ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে। সোমবার সকালে এই তথ্য নিশ্চিত করে নীলফামারী-৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সীমান্ত পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।
গত শুক্রবার ভোররাতে নিঝুম অন্ধকারে পঞ্চগড়ের এই সীমান্ত দিয়ে ১০ জন মানুষকে পুশইন বা বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারতের টিয়াপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের সীমান্তে ফেলে রেখে চলে যায়। এর পর থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং অসহ্য প্রতীক্ষার প্রহর। তীব্র শীত, খোলা আকাশের নিচে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আটকা পড়া এই মানুষগুলোর মধ্যে ছিল নিষ্পাপ শিশুও। খাবারের সংকট, পানীয় জলের অভাব আর সীমাহীন আতঙ্কের মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাছে ছিল মৃত্যুসম। সীমান্তে টহলরত স্থানীয় মানুষ তাদের করুন অবস্থা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, কিন্তু বিএসএফ-এর কড়া নজরদারির কারণে তাদের কোনো সহায়তা করাও হয়ে উঠছিল না সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার বিভীষিকাময় বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। ইউসুফ আলী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, রোববার দিবাগত রাত পর্যন্ত তাদের ওপর অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। রাত ১২টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা তাদের একবার সীমান্তের দিকে নিয়ে যায়, আবার কিছু সময় পর ফিরিয়ে আনে। এক দোদুল্যমান পরিস্থিতির মধ্যে শিশুগুলোর কান্নাকাটি সীমান্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে বারবার কেঁপে উঠছিল। গভীর রাতে বিএসএফ যখন তাদের নিয়ে যাচ্ছিল, তখন বাতি বন্ধ করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই কাজ সম্পন্ন করে। শিশুদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি স্থানীয়দের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। পরে রাত আড়াইটার দিকে বিজিবি’র সতর্ক অবস্থানের মুখে বিএসএফ বাহিনী তাদের ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
সীমান্তের এই পুশইন বা পুশব্যাক ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফ-এর উচ্চপর্যায়ের পতাকা বৈঠকের গুরুত্ব এই মুহূর্তে অপরিসীম। লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, বিএসএফ তাদের নিয়ে যাওয়ার সময় বিজিবিকে অবগত করেই নিয়ে গেছে। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন স্থানীয় প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শূন্যরেখায় এভাবে মানুষ আটকে রাখা চরম অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যারা এই পুশইন চেষ্টার পেছনে দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। ১০টি মানুষের জীবনের এই অনিশ্চয়তা যেন পুনরায় আর কোনো সীমান্তে না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। সীমান্ত এলাকাগুলোতে মানবিক সহায়তার বিষয়টি সাধারণত নজরদারির অভাবে অনেকটা আড়ালে পড়ে যায়। কিন্তু এভাবে শিশু ও নারীদের নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। পঞ্চগড়ের মানুষ আশা করছে যে, আগামীতে সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় থাকবে এবং প্রতিবেশী সুলভ আচরণ বজায় রাখার মাধ্যমে বিএসএফ তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
বর্তমানে বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্তের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামবাসীর মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। গত চার দিনে যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে ওই ১০ জন মানুষ এবং স্থানীয় সীমান্তবাসীরা অতিবাহিত করেছেন, তা সহসা মুছে যাওয়ার নয়। শিশুটির কান্না এবং খোলা আকাশের নিচে তাদের রাত কাটানোর দৃশ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হয় সাধারণ ও অসহায় মানুষ। বিজিবি’র এই সফল প্রতিরোধের কারণে বড় ধরনের একটি মানবিক বিপর্যয় এড়ানো গেছে, যা স্থানীয় জনমনে স্বস্তির ছোঁয়া নিয়ে এসেছে।
তবে সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি’র এই সতর্ক অবস্থান যেন ভবিষ্যতেও অটুট থাকে, সেই আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এখন থেকে বিএসএফকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে যাতে কোনোভাবেই শূন্যরেখায় এভাবে কাউকে ফেলে না রাখা হয়। পঞ্চগড়ের এই ঘটনা সারা দেশের মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, দেশের সীমান্ত পাহারায় বিজিবি প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার জন্য আপসহীন।