প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যবসায়িক জগতের উত্থান-পতন যেন এক নিরন্তর প্রবাহ। কখনো সাফল্যের শিখরে আরোহণ, আবার কখনো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে পিছিয়ে পড়া—এই চক্রই অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সম্প্রতি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পপতি ও আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি আবারও সেই সাফল্যের শিখরে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করলেন। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের রিয়েল-টাইম বিলিয়নেয়ার্স তালিকার সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, তিনি এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির খেতাব ফিরে পেয়েছেন। দীর্ঘ লড়াই এবং প্রতিকূলতা পেরিয়ে তার এই প্রত্যাবর্তনের গল্প এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
আদানি গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে অভাবনীয় উত্থান তার সম্পদ বৃদ্ধির মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার মাত্র একদিনেই গৌতম আদানির ব্যক্তিগত সম্পদে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের বিশাল উল্লম্ফন ঘটেছে। এই একক দিনে অর্জিত বিশাল অংকের সম্পদ তাকে প্রতিযোগিতার দৌড়ে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯২০ কোটি ডলার। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি এবং সফটব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মাসায়োশি সনের মতো বিশ্ববিখ্যাত ধনকুবেরদের পেছনে ফেলে আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনীর আসনে আসীন হয়েছেন। এই মুহূর্তে মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ৮০০ কোটি ডলার এবং মাসায়োশি সনের সম্পদ ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
গৌতম আদানির এই সাফল্যের পেছনে তার গ্রুপের প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের ঊর্ধ্বগতি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। আদানি পাওয়ার, আদানি পোর্টস, আদানি এন্টারপ্রাইজেস, আদানি গ্রিন এনার্জি এবং আদানি এনার্জি সলিউশনস—এই কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় আদানির সম্পদের পাহাড় আরও উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, শুধু শুক্রবারই আদানি গ্রিন এনার্জির শেয়ারের দাম ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং আদানি এনার্জি সলিউশনসের শেয়ারের দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত আদানি গ্রুপের প্রধান ছয়টি কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ১৯ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বিশালত্বের প্রমাণ।
আদানির জন্য এই শীর্ষস্থানে ফিরে আসা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি তার গ্রুপটির জন্য এক অসামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ। গত কিছুকাল আগে মার্কিন বিচার বিভাগে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে কিছু জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছিল, যা তার ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে সংকটাপন্ন করে তুলেছিল। সেই কঠিন সময়ে প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম এবং সামগ্রিক বাজারমূল্য উভয়ই নেতিবাচক ধারায় ছিল। তবে শুরু থেকেই গৌতম আদানি এবং তার গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সকল অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মার্কিন বিচার বিভাগ সেই অভিযোগ খারিজ করে দেয়। জালিয়াতির অভিযোগ থেকে মুক্তির খবরটি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জোয়ার নিয়ে আসে। অভিযোগ খারিজ হওয়ার পর গত এক মাসে আদানির সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার বেড়েছে, যা তার প্রতি বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
একজন উদ্যোক্তার জীবনে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তন বিরল। শূন্য থেকে শুরু করে নিজের শ্রম, মেধা ও কৌশল দিয়ে যিনি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, তার জন্য বাধা আসাটা স্বাভাবিক। গৌতম আদানির ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছিল। কিন্তু তিনি এবং তার দল যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন, তা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক শিক্ষণীয় অধ্যায়। শেয়ার বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আদানির এই সম্পদ বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, টেকসই পরিকল্পনা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব যেকোনো সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম।
আদানির এই সিংহাসন পুনরুদ্ধার কেবল তার ব্যক্তিগত বিজয় নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। ভারতের শিল্প খাত যে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে, আদানির এশিয়ার শীর্ষ ধনী হওয়া তার একটি বড় প্রমাণ। তার ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো—বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং গ্রিন এনার্জি—ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্রিন এনার্জির দিকে তার মনোযোগ এবং বিনিয়োগ ভবিষ্যতে তাকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জির চাহিদা বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে, আর সেই সুযোগটি আদানি আগেভাগেই ধরতে পেরেছেন।
তবে শীর্ষ ধনী হওয়ার এই দৌড় এখানেই শেষ নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শেয়ার বাজারের অস্থিতিশীলতার মধ্যে এই অবস্থান বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আদানির সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে শেয়ার বাজারের প্রভাব যেহেতু বেশি, তাই বাজারের ওঠানামা তার অবস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবুও, এখন পর্যন্ত তিনি যেভাবে তার ব্যবসায়িক কৌশল সাজিয়েছেন, তাতে অনেকেই আশাবাদী যে তিনি দীর্ঘকাল এই অবস্থানের মর্যাদা ধরে রাখতে পারবেন। গৌতম আদানির এই গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অধ্যবসায় এবং সত্যের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে যেকোনো বিপর্যয় কাটিয়ে আবারও সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। এশিয়ার শীর্ষ ধনী হিসেবে তিনি এখন নতুন কোন পথে তার ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যান, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।