যুদ্ধবিরতি চুক্তি না হলে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড় নয়: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ৪৫ বার
যুদ্ধবিরতি চুক্তি না হলে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড় নয়: ট্রাম্প

প্রকাশ: ০৮ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সময়। একদিকে দীর্ঘদিনের চলা সামরিক সংঘাত, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে চলছে তীব্র দরকষাকষি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরানের জব্দ থাকা শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা হবে না। এনবিসি নিউজের বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘মিট দ্য প্রেস’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, জব্দ থাকা অর্থ নিয়ে সমঝোতার যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা আপাতত সুদূরপরাহত।

সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি কেবল তখনই বিবেচনা করা হবে যখন একটি মজবুত ও স্থায়ী চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। তিনি ইরানের আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তেহরান যদি ইতিবাচক আচরণ করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবেই আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে ভাবা সম্ভব। ট্রাম্পের এই বক্তব্য ইরানকে মূলত এক ধরণের শর্তসাপেক্ষ আলোচনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের জব্দ থাকা সম্পদের অন্তত একাংশ অবমুক্ত না করা পর্যন্ত আলোচনার সার্থকতা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের অনাস্থা এবং অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তারা বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে এই অর্থছাড়কে একটি পূর্বশর্ত হিসেবেই দেখছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের রেষারেষি অনেক পুরনো। ট্রাম্প ২০১৮ সালে একতরফাভাবে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকেই সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। বর্তমান সংকটকালীন সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত এই স্থবিরতা ভাঙারই একটি চেষ্টা। তবে ট্রাম্প বারবার সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে রেখেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা হয় একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছি, অথবা আমাদের হাতে চূড়ান্ত উপায় হিসেবে ভয়ংকর সামরিক হামলার বিকল্পটি খোলা আছে। তার এই দ্বিমুখী অবস্থান বিশ্ব নেতাদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইরানের পক্ষ থেকে এই অর্থছাড়ের বিষয়টি ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমানে আলোচনার টেবিলে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ইরান চাইছে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে বর্তমানে জব্দ থাকা অর্থের অন্তত ১২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হোক। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক অর্থ ছাড় করতে হবে এবং বাকি অর্ধেক পরবর্তী ধাপে সম্পন্ন হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থ ছাড়ের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, যা ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ জব্দ অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ইরানের অর্থনীতির জন্য এখন অক্সিজেন হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় এই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না তেহরান। গত ৮ এপ্রিল থেকে বড় ধরনের সরাসরি সংঘাত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, দুই পক্ষের মাঝেমধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। ট্রাম্পের দাবি, সংঘাতের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে খামেনি আহত হওয়ার পর থেকে তাকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। মোজতবা খামেনির বর্তমান অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প রহস্যময় মন্তব্য করলেও, তিনি যে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর থেকে নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন, তা স্পষ্ট।

ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে বিশ্বজুড়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, শান্তি চুক্তি কি আদৌ সম্ভব? যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তিনি আপাতত বাদ রাখলেও, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। একদিকে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি, অন্যদিকে ইরানের সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা—এই দুই মেরুর অবস্থানে শান্তি আলোচনা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইরানের এই স্নায়ুযুদ্ধ কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।

শান্তি আলোচনার টেবিলে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন চরম ঝুঁকিতে। ট্রাম্পের কঠোর বার্তা এটিই নির্দেশ করে যে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে তিনি সরতে রাজি নন। উল্টো দিকে ইরান তার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। খামেনির রাজনৈতিক ও সামরিক উপদেষ্টা পর্যায়ে যে মতপার্থক্য বা পরিস্থিতির বিশদ বিশ্লেষণ উঠে আসছে, তাতে এটিই প্রমাণিত হয় যে, উভয় পক্ষই এখন নিজেদের জয়ের দাবি নিয়ে অনড়। সাধারণ ইরানীয় জনগণ এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তারা এখন কেবল একটি কূটনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় আছেন, যা তাদের জব্দ হওয়া সম্পদের পথ প্রশস্ত করবে এবং দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনবে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই মন্তব্যের পর, শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে তেহরানের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com