পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিলের রায় আগামীকাল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিলের রায় আগামীকাল

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ এবং রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি পরিবর্তনের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো জড়িয়ে থাকা এই সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফয়সালার পথে রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আগামী বৃহস্পতিবার সংবিধানের এই পঞ্চদশ সংশোধনীর ওপর করা আপিলের রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছেন। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ টানা তিন দিনের শুনানি শেষে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। বুধবার শেষ হওয়া এই শুনানিতে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইনজ্ঞরা এবং আবেদনকারী পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা সংবিধানের বিভিন্ন ধারা ও এর বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত যুক্তি উপস্থাপন করেন।

আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনীটি সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয়, যা পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছে বলে সমালোচকরা দাবি করেন। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি, সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি পুনর্বহাল এবং অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো কঠোর শাস্তির বিধানও এই সংশোধনীর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পুরো আইন এবং এর বিভিন্ন ধারার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

২০২৪ সালে এই সংশোধনীর বিভিন্ন ধারার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট ব্যবস্থা বিলোপ-সংক্রান্ত আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারা বাতিল ঘোষণা করেন। এছাড়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকেও বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এই রায়টি রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। হাইকোর্টের এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত বছরের ৮ জুলাই প্রকাশিত হওয়ার পর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পৃথক পৃথকভাবে লিভ টু আপিল দায়ের করেন।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করার পর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার নতুন মোড় নেয়। এরপর গত বছরের ৩ ডিসেম্বর থেকে দফায় দফায় শুনানির ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন যে, পঞ্চদশ সংশোধনীটি একটি স্বৈরাচারী প্রক্রিয়ায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা জনগণের মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুখুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অন্য আইন কর্মকর্তারা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বহাল রাখার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানগুলো বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা আইনি যুক্তি প্রদর্শন করেন।

দীর্ঘ এই শুনানি চলাকালীন আপিল বিভাগের কার্যতালিকা কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং নানা আইনি জটিলতায় শুনানি স্থগিত রাখতে হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু করে জুনের শেষভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত সোমবার থেকে চূড়ান্ত শুনানি পুনরায় শুরু হয় এবং বুধবার আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণার জন্য কালকের দিনটি নির্ধারণ করেন। এই রায়টি কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পথচলা নির্ধারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল, যেখানে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে দীর্ঘদিনের এই ধোঁয়াশা ও আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি ঘটার অপেক্ষায় রয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোর যে দাবি দীর্ঘকাল ধরে রাজপথে ধ্বনিত হয়েছে, তার আইনি মীমাংসা এই রায়ের মাধ্যমেই হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানগুলো বজায় থাকবে কি না, তা নিয়েও জনমনে কৌতূহল রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত যে রায়ই প্রদান করুন না কেন, তা দেশের সংবিধানকে আরও শক্তিশালী ও সর্বজনীন করার ক্ষেত্রে একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, আগামীকাল বৃহস্পতিবারের রায়টি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। আদালতের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছে রাজনৈতিক দলগুলোসহ দেশের সচেতন মহল। আইন ও বিচারের শাসন যে কোনো দেশের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ, আর সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের পবিত্র দায়িত্ব। ‘একটি বাংলাদেশ অনলাইন’ সবসময়ই নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে অবিচল। আমরা এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছি এবং আদালতের প্রতিটি পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার বিস্তারিত তথ্য আপনাদের কাছে সবার আগে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আশা করা যাচ্ছে, এই রায় সাংবিধানিক সংকট নিরসন করে দেশে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত