প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান নানা সমীকরণের মাঝে পাবনার চাটমোহরে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় সরব হয়ে উঠলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। বৃহস্পতিবার রাতে চাটমোহর বালুচর মাঠে আয়োজিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ শীর্ষক কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেন। তার ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে এবং দলটির দাফন দিল্লির মাটিতেই হয়েছে।
সারজিস আলম তার বক্তৃতায় বলেন, বিগত ১৬ বছর ধরে দেশের প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছিল, যা চরম লজ্জাজনক। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি খুনি ও স্বৈরাচারী দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তারা গণহত্যা চালিয়ে দেশ থেকে পালিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, যে রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম দিল্লিতে, তাদের দাফনও সেখানেই সম্পন্ন হয়েছে। তাই এখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় দেশের জনগণকে বাংলাদেশপন্থি রাজনৈতিক শক্তিকেই বেছে নিতে হবে। দিল্লির কোনো দল বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য দালালতন্ত্র, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির যে বিষবৃক্ষ সমাজকে গ্রাস করেছে, তা সমূলে উৎপাটন করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন সরকারি প্রতিটি সেবা পেতে কোনো দালালের দ্বারস্থ না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, যা কোনোভাবেই একটি স্বাধীন দেশের চিত্র হতে পারে না।
শিক্ষা খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে কার্যকর ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সারজিস আলমের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও লুটপাটের মানসিকতার কারণে হাসপাতালের খাবারের টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবামূলক খাতে হস্তক্ষেপ চলছে, যার ফলে সাধারণ রোগীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কমিটির অস্বচ্ছতা নিয়েও তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে যোগ্য ও মেধাবীদের বদলে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে, যা জাতীয় মানোন্নয়নে বড় অন্তরায়।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া মাদক, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এবং যারা এখনো নতুন করে ফ্যাসিবাদী কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। বিএনপির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেই তাদের নেতাকর্মীরা প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। প্রশাসনকে হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং দেশের জনগণের সেবক। তিনি প্রশাসনকে কোনো দলের প্রতীক না হয়ে বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে ওঠার আহ্বান জানান।
এনসিপির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে রাজনৈতিক অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেন সারজিস আলম। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার স্বপক্ষে বিন্দুমাত্র কোনো প্রমাণ আজ পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি। এ ধরনের ভিত্তিহীন প্রচারণা চালিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের এই লড়াই ভাল বনাম মন্দের, ন্যায় বনাম অন্যায়ের এবং জালিম বনাম মজলুমের। তিনি জনগণকে সততা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে প্রার্থী যাচাই করে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। আগামী দিনের বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও লুটপাটের রাজনীতি যেন আর ফিরে না আসে, সেজন্য প্রতিটি নাগরিককে সজাগ থাকতে হবে।
উক্ত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজ, পাবনা জেলা এনসিপি নেতা বরকতুল্লাহ ফাহাদ এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদ জাহিদুল ইসলামের বাবা দুলাল উদ্দিন মাস্টারসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বক্তারা প্রত্যেকেই তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আগামীর একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।