সেমিফাইনালে ফ্রান্স: দেশমের কণ্ঠে অদম্য আত্মবিশ্বাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
সেমিফাইনালে ফ্রান্স: দেশমের কণ্ঠে অদম্য আত্মবিশ্বাস

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ফ্রান্স মানেই এখন এক অজেয় শক্তির নাম। বৃহস্পতিবার বস্টনের মাঠে মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে ২-০ গোলের জয় তুলে নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। ম্যাচের বাঁশি বাজার পর থেকেই পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে ফরাসি সমর্থকদের উন্মাদনা আর জয়ের আনন্দধ্বনি যেন আকাশ ছুঁয়েছিল। তবে মাঠের উত্তেজনার চেয়েও বড় শিরোনাম হয়ে দাঁড়িয়েছে কোচ দিদিয়ের দেশমের সেই শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করা কথাগুলো— ‘এই দল কখনো বিশ্বাস হারায় না’।

ম্যাচ শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসে ফরাসি কোচ তার দলের খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি এবং শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, জয় কেবল পায়ের কারুকার্যে আসে না, এর পেছনে প্রয়োজন অটুট মানসিক দৃঢ়তা। ম্যাচের প্রথমার্ধে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিস এবং বেশ কিছু সহজ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর যখন গ্যালারিতে থাকা সমর্থকরা কিছুটা উদ্বেগ অনুভব করছিলেন, তখনো ডাগআউটে থাকা দেশম ছিলেন অবিচল। তার কাছে এই ছোটখাটো ব্যর্থতাগুলো কেবল জয়ের পথে আসার ছোটখাটো বাধা ছিল মাত্র, যা অতিক্রান্ত করা অসম্ভব কিছু ছিল না।

দেশম অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় দলের বিশ্বাসের কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ফুটবল মাঠে কঠিন মুহূর্ত আসাটাই স্বাভাবিক। চাপের মুখে পড়ে সুযোগ নষ্ট হওয়া কিংবা প্রতিপক্ষের কৌশলের কাছে সাময়িক আটকা পড়া— এসবই খেলার অংশ। কিন্তু আসল চ্যাম্পিয়ন সেই দল, যারা এই প্রতিকূলতাগুলোকে জয় করতে জানে। ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা প্রমাণ করেছে যে, তারা যখন মাঠে নামে তখন প্রতিটি সেকেন্ড তারা নিজেদের পরিকল্পনার প্রতি অনুগত থাকে। কোনো পরিস্থিতিই তাদের ছন্দপতন ঘটাতে পারে না, কারণ তাদের মজ্জায় মিশে আছে জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

মরক্কোর মতো প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা যে মোটেও সহজ ছিল না, সে কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন দেশম। তিনি বলেন, এবারের বিশ্বকাপে মরক্কো যে সাহসিকতা আর কৌশলের পরিচয় দিয়েছে, তাতে তাদের ছোট করে দেখার কোনো অবকাশই ছিল না। আফ্রিকার এই দলটি যেভাবে পুরো টুর্নামেন্টে বড় বড় দলকে নাজেহাল করেছে, তাতে তাদের বিপক্ষে জয় পাওয়া ফ্রান্সের জন্য একটি বিশেষ তৃপ্তির জায়গা। এই জয় কেবল সেমিফাইনালে ওঠার পথই সুগম করেনি, বরং ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে আরও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

তরুণ মিডফিল্ডার ওয়ারেন জাইরে-এমেরির প্রশংসা করতে গিয়ে দেশমের চোখেমুখে ছিল একধরনের উজ্জ্বলতা। তিনি মনে করেন, আধুনিক ফুটবলে তরুণ প্রতিভার সঠিক সমন্বয়ই একটি দলকে ভারসাম্য এনে দিতে পারে। জাইরে-এমেরি যেভাবে মাঠের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং দলের ছন্দ বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছেন, তাতে তিনি অদূর ভবিষ্যতে ফ্রান্সের ফুটবলের এক অবিচ্ছেদ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠবেন বলে দেশম দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন। এটি কেবল একজন কোচের মন্তব্য নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ অভিভাবকের দূরদর্শী পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন।

২০১২ সালে যখন দিদিয়ের দেশম ফ্রান্সের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন থেকেই তিনি একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। গত প্রায় দেড় যুগে তিনি যা অর্জন করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসে সত্যিই বিস্ময়কর। তার অধীনে ফ্রান্স সাতটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছে এবং এর মধ্যে পাঁচবারই তিনি দলকে শেষ চারের মঞ্চে নিয়ে গেছেন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, ফ্রান্সের এই সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঠিক পরিকল্পনা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফসল। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই আজ ফ্রান্সকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ আসনে বসিয়ে রেখেছে।

তবে সেমিফাইনালের এই উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে এখনই আত্মতৃপ্তির সাগরে ডুব দিতে রাজি নন অভিজ্ঞ এই কোচ। সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত সতর্কতা ও পরিণামদর্শিতার সাথে সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেন যে, আসল পরীক্ষা তো এখন থেকেই শুরু। তিনি বলেন, আমরা সেমিফাইনালে উঠেছি ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য এখনও অনেক দূরে। আমাদের এখন পা মাটিতে রেখেই পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। আত্মতুষ্টিই হলো বড় শত্রু, আর আমরা সেই ফাঁদে পা দিতে চাই না। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আলাদা আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং প্রতিটি ম্যাচেই জয়ের ক্ষুধা থাকতে হবে সমানভাবে।

এখন পুরো ফ্রান্সের চোখ এখন সেমিফাইনালের মঞ্চে। টানা তৃতীয়বারের মতো শেষ চারে খেলা ফ্রান্সের কাছে এটি কেবল অন্য একটি ম্যাচ নয়, বরং আরেকটি ফাইনাল নিশ্চিত করার লড়াই। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফরাসি সমর্থকরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন কখন তাদের প্রিয় দল ট্রফি জয়ের আরও একটি ধাপ অতিক্রম করবে। দেশম এবং তার শিষ্যদের ওপর আস্থা রাখা কোটি মানুষের বিশ্বাস, এই অদম্য ফ্রান্স দল যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলছে, তা তাদের শিরোপার গন্তব্যে নিয়ে যেতে সক্ষম। বস্টনের সেই জয়ধ্বনি এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো পৃথিবীতে, জানান দিয়ে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স আবারও প্রস্তুত বিশ্বজয়ের নতুন ইতিহাস লিখতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত