প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলমান নৃশংস সামরিক অভিযান এবং নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যার জেরে মার্কিন জনমতে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে ইসরাইলের অটুট মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থন এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইসরাইলি জনগণের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সালে যেখানে ৬৭ শতাংশ মার্কিনি ইসরাইলি জনগণের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, সেখানে বর্তমানে তা মাত্র ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। গাজা গণহত্যা এবং মানবিক বিপর্যয়ের করুণ চিত্র মার্কিন জনমানসে ইসরাইলি রাষ্ট্র এবং সরকারের প্রতি এক গভীর অনীহা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই সমীক্ষাটি কেবল ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি মনোভাবেরই প্রতিফলন নয়, বরং এটি মার্কিন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মার্কিনি কেবল ইসরাইলি সরকারই নয়, বরং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং হামাসের কর্মকাণ্ডের প্রতিও নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলি সরকারের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের বিরূপ মনোভাব তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গাজায় ত্রাণ কর্মকর্তাসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তুললেও যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রতিক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী ও কাঠামোগত রূপ নিয়েছে।
বয়সভিত্তিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে এই জনমত পরিবর্তনের চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তরুণ প্রজন্মের মার্কিনিদের মধ্যে ইসরাইলি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি এক গভীর অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। ৩০ বছরের কম বয়সী মার্কিন নাগরিকদের একটি বিশাল অংশ এখন ইসরাইলের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। সমীক্ষার তথ্যমতে, এই বয়সের ৫৯ শতাংশ মার্কিনি ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখেন, যেখানে ইসরাইলিদের প্রতি সমর্থন মাত্র ৩২ শতাংশে সীমাবদ্ধ। তরুণ প্রজন্মের এই মানসিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, নৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা প্রচলিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বাইরে গিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
রাজনৈতিক দলভিত্তিক বিভাজনেও এই পার্থক্যের প্রতিফলন ঘটছে। বিশেষ করে তরুণ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন অভাবনীয় মাত্রায় বেড়েছে। প্রায় ৭২ শতাংশ তরুণ ডেমোক্র্যাট ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, আর ইসরাইলিদের প্রতি ইতিবাচক মত দিয়েছেন মাত্র ২৬ শতাংশ। এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ও নীতি নির্ধারণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই পরিবর্তনের ধারা লক্ষণীয়। কয়েক বছর আগেও যেখানে রিপাবলিকান সমর্থকরা ইসরাইলের প্রতি অন্ধ সমর্থন দেখাতেন, এখন সেখানে সমর্থন প্রায় সমান সমান পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সমর্থনের এই সমীকরণ পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুটি আর আগের মতো একতরফা নেই।
গাজার প্রতিটি বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি এবং মাটির নিচে চাপা পড়া প্রতিটি নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদ এখন আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মার্কিন নাগরিকদের হৃদয়ে দোলা দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গ্লোবাল মিডিয়ার কল্যাণে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র এখন আর আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না। গাজায় ত্রাণকর্মী হত্যার ঘটনাটি মার্কিন জনমনে এক গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করেছে, কারণ ত্রাণকর্মীরা বিশ্বব্যাপী মানবিকতার প্রতীক। যখন দেখা যায় যে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী কোনো বাছবিচার ছাড়াই মানবিক সহায়তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তখন সাধারণ মার্কিনিদের মনে ইসরাইলি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ইসরাইলি সরকারের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক মনোভাব মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপরও পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করছে। যে মার্কিন প্রশাসন দশকের পর দশক ধরে ইসরাইলকে অঢেল সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে, তাদের পক্ষে এখন নিজ দেশের জনমতের বিরুদ্ধাচরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তরুণ প্রজন্মের এই জোরালো কণ্ঠস্বর আগামী দিনের নির্বাচনগুলোতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা এখন অনুধাবন করতে পারছেন যে, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদাকে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্রকে সমর্থন দিলে তা জনগণের কাছে কতটা অগ্রহণযোগ্য হতে পারে।
মানবিক বিপর্যয়ের এই করুণ সময়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের এই সহমর্মিতা বিশ্বশান্তির পথে এক নতুন সংকেত। মানুষ এখন বিভাজন বা ভূ-রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে দেখতে শিখছে। ইসরাইলের প্রতি সমর্থকদের এই ধস প্রমাণ করে যে, শক্তির দাপট বা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে চিরকাল ন্যায়বিচারকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না। বিশ্বজনমত আজ গাজার মজলুম মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন প্রজন্মের জনমত সেই বৈশ্বিক জাগরণেরই একটি অংশ। গাজা গণহত্যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে, তবে একই সাথে এটি বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে—মানুষের অধিকার ও মর্যাদা যে কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানা বা রাজনীতির চেয়ে বড়।
পরিশেষে বলা যায়, ইসরাইলের প্রতি মার্কিন জনসমর্থনের এই ধস কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি নৈতিক পরাজয়। মার্কিন নাগরিকরা আজ বুঝতে পেরেছে যে, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। ইসরাইলি সরকার যদি তাদের ধ্বংসাত্মক ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তবে অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন জনমতের এই সমর্থন আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো রাষ্ট্র যখন তার জনগণের বিবেক ও মানবিকতাকে উপেক্ষা করে চলে, তখন সেই রাষ্ট্র তার মিত্রদের সমর্থনও হারাতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার চিরচেনা সমীকরণটি আজ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে, যা গাজার নিরীহ মানুষের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে এক কঠিন ও সত্য বাস্তবতার উন্মোচন ঘটিয়েছে।