হিন্দুপাড়ায় জামায়াত আমির: দুর্যোগে ধর্ম নয়, মানুষের পরিচয়ই বড়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
হিন্দুপাড়ায় জামায়াত আমির: দুর্যোগে ধর্ম নয়, মানুষের পরিচয়ই বড়

প্রকাশ: ১০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় যখন জনপদ তলিয়ে যায়, তখন সংকটের রঙ হয়ে ওঠে ধূসর। অবিরাম বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরি এলাকা আজ এক বিশাল জলমগ্ন মানচিত্র। এই দুর্গত জনপদে বিপন্ন মানুষের পাশে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার সকালে তিনি যখন চট্টগ্রামের এই বন্যাকবলিত এলাকায় পৌঁছান, তখন চারদিকে কেবল অথৈ পানি আর হাহাকার। তিনি সোজা ছুটে যান স্থানীয় ‘হিন্দুপাড়া’ নামে পরিচিত জেলেপল্লীতে। সেখানে বেশিরভাগ বাসিন্দাই সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং অত্যন্ত নিম্ন আয়ের মানুষ। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে বিরোধীদলীয় নেতার এই উপস্থিতি দুর্গত মানুষের মনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে।

গুনাগরি এলাকার এই হিন্দুপাড়ার অবস্থা দেখলে যে কারো হৃদয় ভারাক্রান্ত হওয়ার কথা। টানা তিন দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এখানকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। কোথাও পানির উচ্চতা ঘরের মেঝ ছাড়িয়ে চাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার তিন দিন ধরে বাড়িঘর ছেড়ে স্থানীয় একটি দোকানের দ্বিতীয় তলা বা উঁচু কোনো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। ক্ষুধার্ত শিশু, শয্যাশায়ী বৃদ্ধ আর নিঃস্ব জেলে পরিবারগুলো যখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাঁদছিল, ঠিক তখনই ডা. শফিকুর রহমান কোমরসমান পানি মাড়িয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান।

ত্রাণ বিতরণের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর এই মানবিক সংযোগ। তিনি প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে প্রবীণ, নারী ও শিশুদের খোঁজখবর নেন। তাদের আর্তনাদ শোনেন। স্থানীয় বাসিন্দা কিরণ বালা জলদাস আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন যে, এই চরম বিপদের দিনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো মানুষ খুব কমই ছিল। তারা যখন সব আশা ছেড়ে দিচ্ছিলেন, তখন জামায়াত আমিরের এই সফর তাদের নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছে। ফারাছা বেগম নামে আরেকজন ভুক্তভোগী জানালেন, তিন দিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে কাটানোর পর যখন ঘরে ফেরার কোনো পথ ছিল না, তখন ডা. শফিকুর রহমানের সাহায্য ও সহানুভূতি তাদের চোখে এক ফালি আশার আলো হয়ে ধরা দিয়েছে।

ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডা. শফিকুর রহমান এক অনন্য মানবিক বার্তা দেন। তিনি বলেন, দুর্যোগের সময় মানুষের পরিচয় একটাই—সে একজন বিপন্ন মানুষ। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা রাজনৈতিক পরিচয় এখানে কোনোভাবেই বিবেচ্য হতে পারে না। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি প্রতিটি মানুষের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিপদের দিনে মানুষ যখন অসহায় থাকে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই ইবাদত। তার এই বক্তব্য বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার এক নতুন উদাহরণ হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।

এই জেলেপল্লীর কয়েক শ পরিবার আজ বানের জলে ভাসছে। অনেকের মাছ ধরার জাল, নৌকা ও সংসারের যাবতীয় আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। গবাদিপশু হারানোর বেদনায় অনেকে বাকরুদ্ধ। একটি দরিদ্র জেলে পরিবারের জন্য জাল বা নৌকা হারানো মানে তাদের জীবিকার উৎস হারানো। ডা. শফিকুর রহমানের এই সফর কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যাপারেও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ত্রাণ কার্যক্রম পুরো চট্টগ্রাম জুড়েই চালানো হচ্ছে, তবে হিন্দুপাড়ার এই দৃশ্যটি মানবিকতার এক ভিন্ন উচ্চতা স্পর্শ করেছে।

রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে মানুষের সেবায় বিরোধীদলীয় নেতার এই ঝাঁপিয়ে পড়া এক প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত। জাতীয় সংসদে তার কঠোর অবস্থান বা রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীত মেরুতে যারা অবস্থান করেন, তারাও আজ স্বীকার করছেন যে, দুর্যোগের মুহূর্তে মানুষের জন্য তার এই আন্তরিকতা রাজনীতিকে মানবিক করে তুলেছে। তিনি যখন কোমরসমান পানি ভেঙে প্রবীণদের মাথায় হাত রাখছিলেন বা শিশুদের কোলে তুলে নিচ্ছিলেন, তখন কোনো রাজনৈতিক নেতাকে নয়, বরং একজন অভিভাবককেই দেখছিল চট্টগ্রামের এই জলমগ্ন জনপদ।

বন্যার্ত মানুষের এই দীর্ঘশ্বাসে আমাদের সবাইকে শরিক হতে হবে। কেবল দল বা মতাদর্শের ভিত্তিতে ত্রাণ নয়, বরং মানবতার খাতিরে যার যা সামর্থ্য আছে, তা নিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। ডা. শফিকুর রহমানের এই সফর বার্তা দিচ্ছে যে, বিভেদ ভুলে মানুষ যদি মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তবে কোনো দুর্যোগই আমাদের দমাতে পারবে না। আজকের এই হিন্দুপাড়ার প্রতিটি মানুষ হয়তো আজ আর একা বোধ করছে না। কারণ তারা জানে, অন্ধকারে ডুবে থাকলেও আলো দেখানোর মতো মানুষ এখনো পৃথিবীতে আছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাঁশখালীর এই বন্যাকবলিত জনপদে আজ ধর্মের বিভেদ ঘুচে গেছে মানবিকতার জোয়ারে। ডা. শফিকুর রহমানের এই সফর শুধু ত্রাণ বিতরণের একটি রুটিন ওয়ার্ক ছিল না, এটি ছিল আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার একটি অঙ্গীকার। দুর্যোগ আমাদের শেখায় যে, মানুষ সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকে যখন, তখন তার কাছে ধর্মের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আশ্রয়। জামায়াত আমিরের এই মানবিক পদচারণা বাংলাদেশের রাজনীতির ধারায় এক নতুন ও ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচন করল, যা সব রাজনৈতিক দলের জন্যই অনুকরণীয় হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত