প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রকৃতি যেন তার অকৃপণ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশের আকাশজুড়ে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ওপর দিয়ে যে প্রবল বর্ষণ বয়ে গেছে, তা ছিল বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনন্য। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি বর্ষা মৌসুমের এক দিনে সর্বোচ্চ। বৃষ্টির এই তীব্রতায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও প্রকৃতিতে ফিরে এসেছে সজীবতা। তবে একই সঙ্গে উত্তরের জনপদ ও পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে পারে।
রাজধানীর আকাশে গত কয়েকদিন ধরেই ঘন কালো মেঘের আনাগোনা ছিল, কিন্তু রবিবারের বৃষ্টি ছিল অভাবনীয়। সাধারণত জুলাই মাসে ঢাকায় গড় বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ৩৭৫ মিলিমিটারের কাছাকাছি। সেই হিসেবে মাত্র এক দিনের বৃষ্টিপাতে মাসের অর্ধেক বৃষ্টিপাত সম্পন্ন হয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পশ্চিমা লঘুচাপের মিথস্ক্রিয়া এই ব্যাপক বৃষ্টিপাতের মূল কারণ। ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ মধ্য ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এই ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের কবলে পড়েছে। রাজধানী যেখানে বৃষ্টির কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে, সেখানে চট্টগ্রাম ও সংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৬০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গেছে, যা স্বাভাবিক জনজীবনকে করেছে বিপর্যস্ত।
ঢাকায় এক দিনে ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত অনেক বেশি মনে হলেও, আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাসের তুলনায় এটি রেকর্ড ভাঙার মতো নয়। ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় রেকর্ড করা ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত এখনও সর্বকালের সর্বোচ্চ হিসেবে টিকে আছে। এরপরেও ২০০৯ সালে ৩৩৩ মিলিমিটার এবং ১৯৫৬ সালে ৩২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ২০২২ সালের ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে দুই শতাধিক মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের অভিজ্ঞতা শহরবাসী পেয়েছে। তারপরও এবারের বৃষ্টি শহরতলীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বুলেটিন অনুযায়ী, বৃষ্টিপাত এখন ঢাকা থেকে সরে গিয়ে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং সিলেট বিভাগের অধিকাংশ স্থানে দমকা হাওয়াসহ মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলগুলোর কোথাও কোথাও অতিভারী বর্ষণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের নদ-নদীর পানির স্তর নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে বান্দরবান, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, যা স্থানীয়দের মনে বন্যার আতঙ্ক জাগিয়ে তুলেছে।
আগামী চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা থাকায় নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের মানুষকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও, নতুন করে বৃষ্টিপাত বাড়লে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিটি মুহূর্তে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্পগুলোও বেশ দীর্ঘ। এক দিকে বৃষ্টির কারণে ঘর থেকে বের হওয়া দায়, অন্যদিকে নদীপাড়ের মানুষেরা তাদের ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। শহর থেকে গ্রামের কৃষক পর্যন্ত সবাই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু অতিবৃষ্টির এই তীব্রতা অনেক সময় আশার চেয়ে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর ভাঙন মোকাবিলায় যে পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন, তার গুরুত্ব নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। সরকারি সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া নিয়মিত আপডেট এবং উদ্ধারকারী দলগুলোর তৎপরতা এই দুর্যোগ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের জন্য একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগামী কয়েকদিন দেশজুড়ে সতর্কতামূলক বার্তা বহাল থাকবে বলে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন। সক্রিয় মৌসুমি বায়ু যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বৃষ্টির এই ধারা অব্যহত থাকতে পারে। সাধারণ মানুষকে বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টির সময় নিরাপদে থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে এখন নীতি-নির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে। প্রকৃতি যখন তার অসীম ক্ষমতা নিয়ে হাজির হয়, তখন মানুষের অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হয় ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাশক্তিও। এই বৃষ্টির শেষে হয়তো আবারও এক সুন্দর সজীব বাংলাদেশের অপেক্ষায় থাকবে প্রতিটি মানুষ।