গুণগত জনসংখ্যাই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি: রাষ্ট্রপতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
গুণগত জনসংখ্যাই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি: রাষ্ট্রপতি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু জনসংখ্যার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই জনসংখ্যা কতটা শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল—তার ওপরই নির্ভর করে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভবিষ্যৎ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গুণগত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যাই একটি দেশের প্রধান সম্পদ, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত, অদক্ষ ও বেকার জনসংখ্যা দেশের উন্নয়নের পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের প্রতি আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নির্ধারিত হয় তার জনগণের সক্ষমতার মাধ্যমে। কোনো দেশের জনসংখ্যা যতই বড় হোক না কেন, যদি সেই জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মদক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে সেই জনসংখ্যা সম্ভাবনার পরিবর্তে বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই জনসংখ্যাকে উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, অদক্ষ ও বেকার জনসংখ্যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, শ্রমবাজার, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনসেবাসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে নতুন নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার জন্ম হয়, যা রাষ্ট্রের উন্নয়নকে ব্যাহত করতে পারে। এ বাস্তবতায় জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনাকে কেবল পরিবার পরিকল্পনা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূমি, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অবকাঠামোর তুলনায় দেশের জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। এর পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, পরিবেশগত ঝুঁকি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

তিনি উল্লেখ করেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এবং অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’। বিশ্বের অনেক দেশ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নজির স্থাপন করেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলে শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়নের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশও একই সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে রাষ্ট্রপতি সতর্ক করে বলেন, এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনা হারিয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের কারণে বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে মানবসম্পদ উন্নয়নের বিকল্প নেই। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা, স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছে যায়।

তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা একটি বহুমাত্রিক বিষয় হওয়ায় এর সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রের সম্পর্ক রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্য খাতের তৃণমূল পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রেস্ট এবং সনদপত্র বিতরণ করেন। তিনি স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার পরিকল্পনা কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবদানের প্রশংসা করে বলেন, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তাদের নিরলস প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা।

বক্তারা বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং পরিকল্পিত পরিবার গঠনের মাধ্যমে একটি সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তারা বলেন, জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, সম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সমন্বিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের এই আয়োজন থেকে রাষ্ট্রপতির বার্তা ছিল স্পষ্ট—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দেশের মানুষের ওপর। পরিকল্পিত জনসংখ্যা, দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং সুশাসনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দেশের জনমিতিক সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি খাত এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে একটি সমৃদ্ধ, টেকসই ও উন্নত বাংলাদেশের প্রধান ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত