প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, ইরাক এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং বিতর্কিত। গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অকুণ্ঠ সমর্থন, এমনকি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোরতম সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে দেওয়া বক্তব্য তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলেছিল।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান রিপাবলিকান এই সিনেটর। মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতিক ও ইসরায়েলপন্থী মহল তাঁকে দৃঢ় অবস্থানের নেতা হিসেবে স্মরণ করছে, অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন, বিশ্লেষক এবং ফিলিস্তিনপন্থী মহল তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করছে।
লিন্ডসে গ্রাহাম যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের দীর্ঘদিনের সিনেটর ছিলেন। কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি এবং চীনের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থানের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন ইসরায়েলের প্রতি তাঁর নিরঙ্কুশ সমর্থনের কারণে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ হারিকেন হেলেন আঘাত হানার পর একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সে সময় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলকে আরও শক্তিশালী সামরিক সহায়তা দেওয়া। তাঁর ভাষ্য ছিল, ইসরায়েল এমন সব শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত যারা দেশটিকে ধ্বংস করতে চায় এবং সেই বাস্তবতায় তাদের আত্মরক্ষার অধিকারকে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।
গাজা যুদ্ধ চলাকালে গ্রাহাম একাধিকবার এমন বক্তব্য দেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধ শুরুর পর তিনি প্রকাশ্যে বলেন, ইসরায়েলের নিজেদের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং পুরো এলাকা ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের পক্ষেও তিনি অবস্থান নেন। তাঁর এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
আরও বিতর্কের জন্ম দেয় তাঁর পারমাণবিক অস্ত্র প্রসঙ্গ। বিভিন্ন জনসভা ও সাক্ষাৎকারে তিনি এমন বক্তব্য দেন, যাতে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। যদিও তাঁর সমর্থকেরা দাবি করেন, এসব বক্তব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল, সমালোচকদের মতে এসব মন্তব্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধনীতির পরিপন্থী।
লিন্ডসে গ্রাহামের রাজনৈতিক অবস্থান শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বহুবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইসরায়েলের জন্য অতিরিক্ত সামরিক সহায়তার পক্ষে কাজ করেন। ২০২১ সালে গাজায় সংঘাতের সময় তিনি ইসরায়েল সফর করেন এবং অতিরিক্ত এক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা অনুমোদনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচিত ছিল।
গ্রাহামের মৃত্যুর পর নেতানিয়াহু তাঁকে স্মরণ করে বলেন, তিনি এমন একজন মার্কিন রাজনীতিক ছিলেন, যিনি অনেক সময় ইসরায়েলের সরকার যা চাইত, তার চেয়েও বেশি সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন। নেতানিয়াহুর মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাহামের অঙ্গীকার ছিল অসাধারণ।
অন্যদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরসহ দেশটির একাধিক রাজনীতিকও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তাঁরা গ্রাহামকে ইসরায়েলের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেন।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে মানবাধিকার সংগঠন ও ফিলিস্তিনপন্থী মহলে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্যালেস্টিনিয়ান কমিউনিটি নেটওয়ার্কের নেতারা বলেছেন, লিন্ডসে গ্রাহাম এমন একজন রাজনীতিক ছিলেন, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনজুড়ে যুদ্ধ, সামরিক দখলদারত্ব এবং কঠোর সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, তাঁর বক্তব্য ও নীতিগত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, গ্রাহামের রাজনৈতিক দর্শনের দুটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—একটি হলো বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা জোরদারের পক্ষে অবস্থান, অন্যটি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাঁর দৃঢ় রাজনৈতিক সমর্থন। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর যখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনীতিক সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সংযত অবস্থান নিতে শুরু করেন, তখনও গ্রাহাম আগের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
চলতি বছরের শুরুতে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি আবারও বিতর্কের জন্ম দেন। তাঁর এ অবস্থান রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও সমালোচনার মুখে পড়ে। কিছু কংগ্রেস সদস্য প্রকাশ্যে তাঁর অতিরিক্ত যুদ্ধমুখী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এমন একজন রাজনীতিককে হারাল, যিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবসময় দৃঢ়, স্পষ্ট এবং আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকার গভীর বিতর্কে ঘেরা। ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রশ্নে তাঁর নিরঙ্কুশ সমর্থন যেমন একপক্ষের কাছে রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক, তেমনি অন্যপক্ষের কাছে তা মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে অত্যন্ত বিতর্কিত অবস্থান।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাঁর দেওয়া বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে কঠোর মন্তব্য এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থান ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যু সেই বিতর্কের অবসান ঘটায়নি; বরং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।