প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি আবারও উঠল স্পেনের হাতে। ২০১০ সালের পর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘লা রোজা’। অন্যদিকে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের সম্ভাব্য সমাপ্তি হলো হৃদয়বিদারক এক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
ফাইনাল ম্যাচটি ছিল দুই ভিন্ন দর্শনের ফুটবলের লড়াই। একদিকে বল দখল, গতিময় আক্রমণ এবং নিখুঁত পাসিংয়ে বিশ্বাসী স্পেন, অন্যদিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করা আর্জেন্টিনা। শুরু থেকেই স্পেন নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে নেয়। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি এবং রদ্রিদের সমন্বিত আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়।
প্রথমার্ধেই একাধিকবার গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল স্পেন। তবে প্রতিবারই আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজ। অসাধারণ প্রতিক্রিয়া, দুর্দান্ত অবস্থান নির্বাচন এবং একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি ম্যাচজুড়ে দলকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখেন। পুরো ম্যাচে তাঁর ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ ফাইনালের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা নিজেদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ছন্দে ফিরতেই পারেনি। লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা সতীর্থদের সমন্বিত আক্রমণ স্পেনের সংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে কার্যকর হয়ে ওঠেনি। মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রির নিয়ন্ত্রণ, দুই প্রান্তে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের গতি এবং ডিফেন্স লাইনের শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থান স্কালোনির পরিকল্পনাকে প্রায় পুরোপুরি ব্যর্থ করে দেয়।
ম্যাচের পরিসংখ্যান স্পেনের আধিপত্যের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। পুরো ম্যাচে প্রায় ৬৬ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল স্পেন। বিপরীতে আর্জেন্টিনার বল দখল ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশের কাছাকাছি। স্পেন একের পর এক আক্রমণ গড়ে তোলে এবং প্রতিপক্ষের বক্সে ২৩ বার প্রবেশ করে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে খুব কম সংখ্যক অর্থবহ আক্রমণ তৈরি করতে সক্ষম হয়। পাসিংয়েও ছিল বিশাল পার্থক্য। স্পেন ৬৪৭টির বেশি সফল পাস সম্পন্ন করে, যেখানে আর্জেন্টিনার সফল পাস ছিল প্রায় অর্ধেকেরও কম।
প্রথম ৯০ মিনিটে গোল না হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতেই। অতিরিক্ত সময়েও একই চিত্র দেখা যায়। আর্জেন্টিনা তখন আরও চাপে পড়ে যায়, বিশেষ করে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর। দশজনের দলে পরিণত হওয়ায় স্কালোনির শিষ্যরা প্রায় পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশল নিতে বাধ্য হয়।
স্পেন সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে আক্রমণের ধারাবাহিকতা থেকে বল পেয়ে ফেরান তোরেস দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে জালে বল পাঠান। সেই গোলেই ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ। শেষ পর্যন্ত আর ম্যাচে ফেরার মতো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি মেসির দল।
এই জয় শুধু একটি বিশ্বকাপ শিরোপা নয়, স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন প্রজন্মের সাফল্যেরও প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার পর এবার বিশ্বমঞ্চেও তারা প্রমাণ করল, নতুন প্রজন্মের হাতে স্পেনের ফুটবল নিরাপদ। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি, রদ্রি, কুবারসি ও ফেরান তোরেসদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দল ভবিষ্যতের জন্যও শক্তিশালী বার্তা দিল।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলগত পরিকল্পনাও ছিল প্রশংসার দাবিদার। তিনি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আক্রমণাত্মক ও আধুনিক ফুটবলের ওপর আস্থা রেখেছেন। প্রতিপক্ষের শক্তি অনুযায়ী কৌশল বদল করলেও বলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েননি। ফাইনালেও সেই একই দর্শন সফল হয়। আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের চাপে রাখতে স্পেন ম্যাচজুড়ে উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত পাসিং এবং উইং ব্যবহার করে আক্রমণ চালিয়ে যায়।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জন্য এটি ছিল কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ম্যাচ। ২০২২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে তারা শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামলেও পুরো ম্যাচে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে পারেনি। মেসিকে ঘিরে স্পেনের বিশেষ পরিকল্পনা ছিল কার্যকর। তাঁকে বলের পর্যাপ্ত জোগান দেওয়া যায়নি, আবার বল পেলেও দ্রুত একাধিক খেলোয়াড় তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। ফলে আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার অনেকটাই কমে যায়।
৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির জন্য এই ফাইনাল বিশেষ আবেগের ছিল। বিশ্বকাপের শেষ মঞ্চ হতে পারে—এমন আলোচনা আগেই ছিল। তবে স্বপ্নের বিদায় লেখা হলো পরাজয়ের মাধ্যমে। শেষ বাঁশি বাজার পর তাঁর হতাশ মুখ, সতীর্থদের নীরবতা এবং সমর্থকদের অশ্রু ফুটবলপ্রেমীদের আবেগাপ্লুত করেছে। যদিও এই পরাজয় তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের অর্জনকে কোনোভাবেই ম্লান করে না।
এদিকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ পরাজিত দলের হয়েও ম্যাচের অন্যতম নায়ক হয়ে থাকলেন। তাঁর অসাধারণ গোলরক্ষণের কারণেই আর্জেন্টিনা দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকে ছিল। একের পর এক নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে তিনি স্পেনকে হতাশ করলেও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে দলের রক্ষণ ভেঙে পড়ে।
ফাইনালের এই জয় স্পেনের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করল। ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তারা ফুটবল বিশ্বের শীর্ষে ফিরে এল। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করল, আধুনিক ফুটবলে তরুণ প্রতিভা, সুশৃঙ্খল দলগত খেলা এবং পরিকল্পিত আক্রমণই সাফল্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সামনে এখন নতুন করে দল গঠনের চ্যালেঞ্জ। মেসি-পরবর্তী যুগে কেমন হবে তাদের পথচলা, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে ফাইনালের এই পরাজয় সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের ধারাবাহিক সাফল্য ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের রাতটি তাই শুধু একটি ফাইনালের স্মৃতি নয়; এটি ছিল এক যুগের অবসান এবং আরেক যুগের সূচনার প্রতীক। স্পেনের হাতে উঠল সোনালি ট্রফি, আর বিশ্ব ফুটবল পেল নতুন এক চ্যাম্পিয়ন, যারা প্রতিভা, গতি, শৃঙ্খলা এবং দলগত নৈপুণ্যের সমন্বয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।