প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুর্নীতির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পুলিশ নীতিগতভাবে তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণে সম্মতি দিলেও, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। ইতোমধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে পাঠানো সেই চিঠি বাংলাদেশ সরকারের হাতে পৌঁছেছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত জবাব প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র জানিয়েছে, প্রায় পাঁচ দিন আগে দুবাই পুলিশের আনুষ্ঠানিক চিঠিটি বাংলাদেশে পৌঁছায়। বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন যৌথভাবে চিঠির প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, সময়মতো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাঠানো গেলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেনজীর আহমেদের মামলার তদন্ত ও প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথিপত্র সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আইনি নথি যাচাই-বাছাই করছেন। দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুবাই পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় দলিলপত্র প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে এবং দ্রুত জবাব পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুবাই পুলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশ কোন আইনের আওতায় এবং কী আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে নিতে চায়। এই প্রশ্নের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বন্দি বা আসামি প্রত্যর্পণ বিষয়ে এখনো কোনো দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর নেই। ফলে আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা এবং ইন্টারপোলের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্রত্যর্পণ কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি, সেই পরোয়ানার কার্যকারিতা এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে কেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয় করছে—এসব বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সহজ হবে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি বাংলাদেশ সরকারকে ই-মেইলে জানায় যে, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করা হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রত্যর্পণের আবেদন করে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যর্পণের আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার বিস্তারিত নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছিল। ওই নথিতে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, বিভিন্ন মামলার বিবরণ, তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগের আইনি ভিত্তি এবং প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য দলিল সংযুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস পর সেই আবেদনের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয় দুবাই পুলিশ।
বর্তমানে বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ের একটি কারাগারে আটক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বাংলাদেশ সরকারের ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
বেনজীর আহমেদ দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তবে পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং জালিয়াতিসহ একাধিক অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালে আদালতের নির্দেশে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়। একই সময় দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদের অনুসন্ধানও শুরু হয়।
তদন্তের মধ্যেই ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং বিভিন্ন আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে, যার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে তাকে শনাক্ত ও আটকের পথ আরও সহজ হয়।
দুদকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং জালিয়াতির অভিযোগে মোট ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত একটি মামলায় ইতোমধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে, অন্য মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে শনাক্ত ও আটক করার ক্ষেত্রে তার কয়েকজন সাবেক সহযোগীর দেওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তারা দুবাই পুলিশের কাছে কিছু তথ্য সরবরাহ করেন বলে জানা গেছে। পরে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দুবাই পুলিশ তাকে একটি শপিং মল এলাকা থেকে আটক করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা, ইন্টারপোলের সমন্বয় এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যর্পণের নজির বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। তবে এ ধরনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি, আদালতের আদেশ, মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে দুবাই পুলিশের চাওয়া ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব দিতে পারলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা আরও জোরালো হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের সব দিক বিবেচনায় রেখেই জবাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ কূটনৈতিক ও আইনি নিয়ম মেনে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন বাংলাদেশ সরকারের ব্যাখ্যার ওপরই নির্ভর করছে এই বহুল আলোচিত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার পরবর্তী অগ্রগতি।