স্থানীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন চায় নির্বাচন কমিশন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩২ বার
স্থানীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন চায় নির্বাচন কমিশন

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাবও চূড়ান্ত করেছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাব অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিক এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা সার্বক্ষণিক কর্মচারীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার মতো কোনো বিধান আপাতত যুক্ত করার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে কমিশন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার আইন সংস্কারের অংশ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন আইন সংশোধনের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলা পরিষদ আইন এই পর্যায়ের সংস্কার প্রস্তাবের বাইরে রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদনের পর সুপারিশ আকারে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে সরকার প্রস্তাব গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে পরিবর্তনগুলো কার্যকর হতে পারে।

ইসির প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের আইনি ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট করা। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা আইনে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞার মধ্যে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের উল্লেখ থাকলেও উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন আইনে সেই সুযোগ স্পষ্টভাবে নেই। নির্বাচন কমিশন এখন সব স্থানীয় সরকার আইনে একই ধরনের বিধান যুক্ত করতে চায়, যাতে প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশ হিসেবে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত করা যায়।

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আইনে সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা মানেই প্রতিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন বাধ্যতামূলক নয়। বরং এটি কমিশনের জন্য একটি আইনি সুযোগ তৈরি করবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী যদি কমিশন মনে করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি প্রয়োজন, তাহলে আলাদা প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই তাদের দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আইনি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত থাকলে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুলিশের মতো নির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, যিনি কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান, গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আইনে বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান রয়েছে। কমিশনের লক্ষ্য হলো সব আইনে অভিন্ন বিধান নিশ্চিত করা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনে সুযোগ থাকলেই যে প্রতিবার সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে, এমন নয়। তবে প্রয়োজন হলে কমিশনের হাতে একটি কার্যকর বিকল্প থাকবে।

নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের পেছনে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে নয়, নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে একই রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কোনো নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। এসব বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে নির্বাচন কমিশন।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধানেও পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরা প্রার্থী হতে পারেন না। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন বাধা নেই। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য পদ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্য সব নির্বাচিত পদে দ্বৈত নাগরিকরা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ হারাবেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সার্বক্ষণিক কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা। বর্তমানে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। নির্বাচন কমিশন মনে করছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এ বিধান প্রয়োজন। ফলে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন হলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

অন্যদিকে সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়ার ওপর মতামত দিতে গিয়ে এই প্রস্তাব দেয়। তবে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের বিধান যুক্ত করতে হলে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সংক্রান্ত মূল আইনে সংশোধন আনতে হবে। বর্তমানে কমিশনের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে না, তাই কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোনো ব্যক্তি যদি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেন এবং অযোগ্যতার কোনো শর্তে না পড়েন, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এসব প্রস্তাব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনি কাঠামোকে আরও সুসংহত করতে পারে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আইনি সুযোগ থাকলে প্রয়োজনের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে এবং ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধও বাড়তে পারে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মতে, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আইনি ভিত্তি সুস্পষ্ট থাকলে প্রয়োজনে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা বাড়বে।

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, আইন সংশোধনের পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনায় নিরপেক্ষ প্রশাসন, শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে শুধু আইন নয়, তার যথাযথ প্রয়োগও অপরিহার্য।

এখন নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ সরকার গ্রহণ করে কি না এবং পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়, সেটিই হবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনি কাঠামোতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত