অস্ত্রোপচারের পর কলেজছাত্রীর মৃত্যু, তদন্তে স্বাস্থ্য বিভাগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৬ বার
অস্ত্রোপচারের পর কলেজছাত্রীর মৃত্যু, তদন্তে স্বাস্থ্য বিভাগ

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচারের পর ১৭ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রীর মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসকের অবহেলা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে নিহতের পরিবার। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, রোগীর শারীরিক অবস্থা জটিল ছিল এবং চিকিৎসা যথাযথ নিয়মেই করা হয়েছে। পরস্পরবিরোধী এসব দাবির মধ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

নিহত আয়েশা আফরিন (১৭) ফরিদপুর সরকারি ইয়াছিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তিনি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের কালিখোলা গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী লিটু মাতুব্বরের বড় মেয়ে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা শেষে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে। কিন্তু সামান্য পেটব্যথার চিকিৎসা করাতে গিয়ে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার আয়েশার তীব্র পেটব্যথা শুরু হলে তাকে শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, তার ছোট আকারের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে। এরপর পরিচিত একজনের পরামর্শে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের বিপরীতে অবস্থিত আলজারা স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নিহতের মা আলেয়া বেগমের অভিযোগ, হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দায়িত্বরত সার্জন ডা. আতিকুল আহসান রোগীকে দেখেন। তিনি দাবি করেন, অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গিয়ে পেটের ভেতরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার ছাড়া বিকল্প নেই। পরিবারের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন করে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার কথা বললেও টেকনিশিয়ান না থাকায় পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এরপরও কোনো নতুন পরীক্ষা ছাড়াই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আলেয়া বেগম অভিযোগ করেন, তারা আরও কিছু সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসক জানান যে তিনি অপেক্ষা করতে পারবেন না এবং অন্য রোগী দেখতে যেতে হবে। অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়ার আশঙ্কার কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে তারা অস্ত্রোপচারে সম্মতি দেন।

পরিবারের দাবি, অস্ত্রোপচারের একপর্যায়ে চিকিৎসক এসে জানান রোগীর নাড়িভুঁড়ি জটিলভাবে জড়িয়ে গেছে। পরে তারা অপারেশন থিয়েটারের বাইরে থেকে দেখতে পান, মেয়ের বুকের নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত বড় অংশ কেটে সেলাই দেওয়া হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পরও তার জ্ঞান ফেরেনি। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত চিকিৎসক ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আতিকুল আহসানের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পরিবারের সদস্যরা। গণমাধ্যমও তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে আলজারা স্পেশালাইজড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হাসপাতালের চেয়ারম্যান শামীম আশরাফ জানিয়েছেন, রোগীর পেটের ভেতরে অন্ত্রে ছিদ্র ছিল এবং সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই কারণেই বড় পরিসরে অস্ত্রোপচার করে সংক্রমিত অংশ পরিষ্কার করতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর অবস্থা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিত জানানো হয়েছিল। পরে রোগীর মা, ফুফাসহ তিনজন স্বজন সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। অস্ত্রোপচারের পর রোগী শকে চলে যাওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ দ্রুত তদন্ত শুরু করেছে। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ না পেলেও বিভিন্ন মাধ্যমে ঘটনাটি জানার পর ডেপুটি সিভিল সার্জন বদরুদ্দোজা টিটুকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে দ্রুত ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সিভিল সার্জন আরও জানান, অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অভিযোগ ওঠায় এবারের ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যদি চিকিৎসাগত অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চলতি বছরের এপ্রিল মাসের আরেকটি অভিযোগ। সে সময় একই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অস্ত্রোপচারের পর মিম (১৪) নামে এক কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছিল তার পরিবার। অভিযোগ ছিল, অস্ত্রোপচারের সময় অসাবধানতাবশত গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ওই কিশোরীর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং রোগী বা স্বজনদের যথাযথভাবে অবহিত করা চিকিৎসা নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইসিইউ সুবিধা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।

তারা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া দরকার। এতে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় থাকবে।

এদিকে আয়েশা আফরিনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠী, শিক্ষক এবং স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরাও বলছেন, তারা কোনো প্রতিশোধ নয়, বরং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেটিই চান।

এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবাই। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে এই মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসাগত অবহেলা ছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত