প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলেও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সুমাইয়া আক্তারের রেখে যাওয়া শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। মাত্র আড়াই মাসের একটি কন্যাসন্তানকে রেখে প্রাণ হারানো তরুণীর পরিবারের অভিযোগ, নানা সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে খোঁজখবর এবং সীমিত আর্থিক সহায়তা মিললেও শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব বা পুনর্বাসনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সীমিত আয়ের সংসারে নাতনিকে মানুষ করতে গিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার নানি আসমা বেগমের।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী নতুন মহল্লার নিজ বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে পরিস্থিতি দেখছিলেন ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় এলাকায় গোলাগুলির মধ্যে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। দ্রুত স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আকস্মিক সেই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সদস্যকে কেড়ে নেয়নি, মা হারিয়েছে তখন মাত্র আড়াই মাস বয়সী শিশু সোয়াইবাও।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই শিশুর জীবনে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বর্তমানে নানি আসমা বেগমের কাছেই বড় হচ্ছে সোয়াইবা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুটির লালন-পালন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে পরিবারের। আসমা বেগম বলেন, সীমিত আয়ের সংসারে নাতনিকে মানুষ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বয়স ও আর্থিক বাস্তবতা তাকে প্রতিনিয়ত উদ্বিগ্ন করে তুলছে। তার প্রশ্ন, তিনি না থাকলে মা-হারা এই শিশুটির দায়িত্ব নেবে কে?
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসমা বেগমের সংসারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সীমিত। তার দুই ছেলে একটি কার্টন কারখানা এবং একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। আরেক ছেলে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। পরিবারের এক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে খিচুনি রোগে আক্রান্ত। অল্প আয়ে সংসার চালানো, চিকিৎসা ব্যয় এবং পড়াশোনার খরচ বহন করতে গিয়ে প্রতিদিনই নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। এর মধ্যেই নাতনির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্বও এসে পড়েছে পরিবারের ওপর।
আসমা বেগম জানান, মেয়েকে হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণে তিনি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবু নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা শুরুতে এসে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। কেউ কেউ আর্থিক সহায়তাও করেছেন। তবে এসব সহায়তা ছিল সাময়িক। শিশুটির শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ জীবনের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ তার।
তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, একটি শিশুর কোনো দোষ নেই। মা হারিয়ে সে বড় হচ্ছে। অন্তত তার ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তায় না থাকে, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত। একটি স্থায়ী পুনর্বাসন বা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সুমাইয়া আক্তার বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার প্রয়াত সেলিম মাতবরের মেয়ে। তার স্বামী মো. জাহিদ একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর সুমাইয়া চাকরি ছেড়ে কুমিল্লায় শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। কন্যাসন্তানের জন্মের পর সুস্থ হওয়ার জন্য ২০২৪ সালের ১২ মে তাকে নবজাতকসহ নারায়ণগঞ্জে মায়ের বাসায় নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছুদিন বিশ্রামের পর আবার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তান জন্মের মাত্র আড়াই মাস পরও অস্ত্রোপচারের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। এমন অবস্থায় আন্দোলনের দিন বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকেরা জানান। মুহূর্তের মধ্যেই নবজাতক শিশুটি হারায় তার মাকে।
ঘটনার পর নিহতের ভগ্নিপতি মো. বিল্লাল বাদী হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর সুমাইয়ার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
আসমা বেগমের ব্যক্তিগত জীবনও একের পর এক ট্র্যাজেডিতে ভরা। জীবিকার সন্ধানে স্বামীর সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন তিনি। তার স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যু সামলানোর আগেই হারাতে হয়েছে আদরের মেয়েকে। এখন নাতনিকে আঁকড়ে ধরেই তার বেঁচে থাকা।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা বা গণআন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে এতিম শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলোচিত ঘটনাগুলোর পরিবারগুলো নীরবে হারিয়ে যায় নানা সংকটের ভিড়ে।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও মনে করে, মা বা বাবা হারানো শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা কর্মসূচি থাকা জরুরি। এতে শিক্ষা বৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মনোসামাজিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমবে।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর এসে সুমাইয়া আক্তারের পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে একটি স্থায়ী সমাধানের। নানি আসমা বেগমের একটাই প্রত্যাশা—তার নাতনি যেন ভবিষ্যতে অভাব, অনিশ্চয়তা কিংবা অবহেলার শিকার না হয়। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে মা-হারা শিশুটির জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলেই বিশ্বাস পরিবারের।