প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের যেকোনো উদ্যোগ প্রতিরোধে উত্তরার জনগণ সবার আগে ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বৈরাচারের বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তাই বিচার, সংস্কার এবং জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
রোববার রাজধানীর উত্তরার মীর মুগ্ধ মঞ্চে ‘রক্তাক্ত জুলাই’ শীর্ষক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ, আহতদের প্রতি সংহতি এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা তুলে ধরতেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঢাকা মহানগর উত্তর এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য, আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, উত্তরা শুধু রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উত্তরার রাজপথ থেকেই গণভবন অভিমুখে ঐতিহাসিক পদযাত্রা শুরু হয়েছিল। একই সময়ে যাত্রাবাড়ী থেকেও আরেকটি মিছিল অগ্রসর হয়, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দ্রুত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। তিনি দাবি করেন, উত্তরার জনগণের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, দুই বছর আগে এই সময় তাকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছিল। একই সময়ে আরও অনেক মানুষ নিখোঁজ বা গুমের শিকার হন বলেও তিনি দাবি করেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই বছর পরও তাদের প্রধান দাবি হচ্ছে স্বৈরাচার এবং সংশ্লিষ্টদের বিচার নিশ্চিত করা। তার মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, যারা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তারা আর ফিরে আসবেন না। তিনি মন্তব্য করেন, যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে উত্তরার জনগণই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তার এই বক্তব্যে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা যায়।
বক্তব্যের আরেক পর্যায়ে তিনি বিএনপির সমালোচনা করেন। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। তিনি বলেন, একসময় যে ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির কথা বিএনপি বলেছিল, এখন দলটি সেখান থেকে সরে এসে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তিনি বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নোট অব ডিসেন্টের পরিবর্তে জনগণের প্রত্যাশা এবং গণরায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের অবস্থান ও সংস্কার নিয়েও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে যদি কোনো প্রতিবেশী দেশের ভূমিকা দেশের নাগরিকদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তার এই মন্তব্যও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে তিনি রাজধানীর উত্তরাকে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সামাজিক অপরাধ দমনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
‘রক্তাক্ত জুলাই’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও বক্তব্য দেন। তারা আন্দোলনের সময় নিহতদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন, বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, জাতীয় যুবশক্তির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদ সোহেল, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর মজুমদার এবং জুলাই আন্দোলনে আহত কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। বক্তারা আন্দোলনের স্মৃতি তুলে ধরে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নিজস্ব অবস্থান ও মূল্যায়ন তুলে ধরছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা আরও তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংলাপ, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারই স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।