জিয়াউলের বাড়িতে দুদকের অভিযান, খতিয়ে দেখা হচ্ছে সম্পদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
জিয়াউলের বাড়িতে দুদকের অভিযান, খতিয়ে দেখা হচ্ছে সম্পদ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে অবস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বাড়িতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচার-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে পরিচালিত এই অভিযানে বাড়িতে থাকা বিভিন্ন সম্পদ, নথিপত্র ও মালামালের তথ্য সংগ্রহ এবং তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযান শেষে তদন্তের অগ্রগতি ও উদ্ধার হওয়া তথ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে দুদকের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। সংস্থাটির উপপরিচালক হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে বাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা আসবাবপত্র, মূল্যবান সামগ্রী এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে সম্পদের তালিকা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজও চলতে থাকে। দুদকের মুখপাত্র তানজীর আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, অভিযান চলমান রয়েছে এবং এটি শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।

দুদকের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযান মূলত চলমান অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত কার্যক্রমের অংশ। তদন্তকারীরা দেখতে চাইছেন, ঘোষিত আয়, সম্পদ এবং বাস্তবে অর্জিত সম্পদের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না। পাশাপাশি জব্দযোগ্য কোনো নথি, সম্পদ বা তথ্য পাওয়া গেলে তা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হবে।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের নামে প্রায় ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।

মামলার অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ স্ত্রী নুসরাত জাহানের সহযোগিতা ও যোগসাজশে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর, হস্তান্তর কিংবা রূপান্তর করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, এই আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি ও উৎস যাচাই করতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের নামে থাকা আটটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনের উৎস, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে তদন্ত এগিয়ে চলছে। রূপগঞ্জের জলসিঁড়ির বাড়িতে পরিচালিত অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্যও ছিল সম্ভাব্য সম্পদ ও মালামালের সঙ্গে মামলার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না তা যাচাই করা।

এর আগে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। যদিও তিনি এরও আগে, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। সে সময় গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে নিউমার্কেট থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজের পদমর্যাদা ও অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, তার কর্মকাণ্ড দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দণ্ডবিধি, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় আর্থিক লেনদেন, সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।

জিয়াউল আহসান সর্বশেষ জাতীয় টেলিযোগাযোগ নজরদারি সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার সরকারের সময় তিনি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় আলোচিত এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে এবং বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে অনুসন্ধান শুরু করে।

দুদকের তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এর আগেও জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের নামে থাকা সম্পদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। গত ২১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫০৬ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর প্লটে অবস্থিত ‘জয়িতা’ নামের আটতলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট প্রশাসনের মাধ্যমে সিলগালা করা হয়। ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন নারায়ণগঞ্জ জেলা রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার পারভেজ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে সম্পদ জব্দ, সংরক্ষণ কিংবা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। বর্তমান অভিযানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্তে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং লেনদেনের ধরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই অভিযানের মাধ্যমে সংগৃহীত নথি ও তথ্য তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের রায়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের দৃষ্টিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন।

রূপগঞ্জে পরিচালিত এই অভিযানকে ঘিরে স্থানীয় এলাকাতেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে বাড়ির আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তদন্ত কার্যক্রমে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্ক ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দুদক জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকবে এবং তদন্ত শেষ হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত