প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ট্রেনের ভেতরে টিকিট চেকার বা টিটির মাধ্যমে বেধড়ক মারধর করার অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী একটি ঘটনার জেরে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো রাজশাহী শিক্ষানগরী। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে এবং অভিযুক্ত টিটির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ সুনির্দিষ্ট চার দফা দাবি আদায়ের দাবিতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থেকে রাজশাহী-ঢাকা রেললাইন অবরোধ করে রেখেছেন। যার সরাসরি পরিণতি হিসেবে বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য সকল অঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের প্রধান শহর রাজশাহীর সরাসরি রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটা থেকে শুরু হওয়া এই আকস্মিক ও তীব্র আন্দোলন এবং রেলপথ অবরোধের কারণে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে কোনো দূরপাল্লার ট্রেন নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতে পারেনি। এর ফলে রেলযাত্রী সাধারণের মাঝে চরম দুর্ভোগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে এবং পুরো স্টেশন চত্বরে এক থমথমে ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যে জানা গেছে যে, এই মর্মান্তিক ও অপমানজনক ঘটনার শিকার ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম ফরহাদ হোসেন, যিনি দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। ট্রেনের ভেতরে সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রসিদ বা টিকিট প্রদান না করেই অবৈধভাবে অতিরিক্ত টাকা আদায় করার মতো একটি অনৈতিক ও দুর্নীতিমূলক কাজের তীব্র প্রতিবাদ করায় ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিকিট চেকার বা টিটি ওই শিক্ষার্থীকে চরম অমানবিক কায়দায় মারধর করেন বলে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। সহপাঠীর ওপর পরিচালিত এই অন্যায় শারীরিক নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে শত শত সাধারণ শিক্ষার্থী তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত সেই টিটির চাকরিচ্যুতি এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে দলবেঁধে রেললাইনের ওপর এসে অবস্থান নেন এবং ট্রেন চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেন।
রেলপথ অবরোধের এই আকস্মিক কর্মসূচির ফলে রাজশাহী স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন এবং একটি নিয়মিত মেইল ট্রেনের নির্ধারিত চলাচলের সূচি মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হয়েছে এবং ট্রেনগুলো প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এক ইঞ্চিও নড়তে পারেনি। তীব্র রোদ ও গরমে ট্রেনের ভেতরে বসে থাকা হাজার হাজার সাধারণ যাত্রী, নারী, শিশু এবং দূরপাল্লার যাত্রীরা এই আকস্মিক অচলাবস্থার কারণে চরম ও অকথ্য ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় বহু যাত্রী বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যা মহাসড়কগুলোতেও কিছুটা বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সুনির্দিষ্ট চার দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেওয়া না হয় এবং অভিযুক্ত টিটির বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের এই শান্তিপূর্ণ অথচ কঠোর রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি কোনো অবস্থাতেই স্থগিত করা হবে না।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং সংবাদমাধ্যমকে জানান যে তাদের একজন শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে টিটির মারধরের শিকার হয়েছেন বলে তারা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লাভ করেছেন। শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই রেললাইন অবরোধের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি আরও জানান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উধ্বর্তন পর্যায়ে জরুরি যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে আলোচনায় বসার এবং একটি সন্তোষজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল বডি যৌথভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং খুব দ্রুত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই জটিল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক বা সিসিএম হাবিবুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, শিক্ষার্থীদের এই হঠাৎ আন্দোলনের কারণে ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে রাজশাহী স্টেশন থেকে ছেড়ে যেতে পারেনি এবং এর ফলে রেলওয়ের শিডিউলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তবে যাত্রী সাধারণের চরম দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য রেল বিভাগ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে। তিনি আরও জানান যে, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করার জন্য রেলওয়ের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন, ট্রেনে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করা কোনো অপরাধ হতে পারে না, বরং যারা আইনের রক্ষক হয়ে আইন ভঙ্গ করেন এবং যাত্রীদের ওপর হাত তোলেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়।