প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এক বছর আগে ঠিক এই দিনে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে ঘটে যাওয়া মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি স্বাভাবিক শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। শ্রেণিকক্ষে পাঠরত শিক্ষার্থীদের হাসি-আনন্দ মুহূর্তেই বদলে যায় কান্না, আতঙ্ক ও অসহনীয় বেদনার দৃশ্যে। সেই মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলেও নিহতদের পরিবারের কাছে সময় যেন এখনও থেমে আছে ২১ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় দুপুরেই। আর যারা প্রাণে বেঁচে ফিরেছিল, তাদের অনেকের জীবনেও আজও রয়ে গেছে গভীর মানসিক ক্ষত।
গত বছরের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বিধ্বস্ত হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় পাইলট, একজন শিক্ষিকা এবং ২৮ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন আরও বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী। ঘটনাস্থলে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। আহতদের দ্রুত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হলেও অনেকের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। দেশের ইতিহাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত অন্যতম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হিসেবে এটি স্মরণীয় হয়ে আছে।
দুর্ঘটনার এক বছর পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আবারও নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, সহপাঠীদের সঙ্গে নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। তবে বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে এখনো রয়ে গেছে সেই দিনের আতঙ্কের ছাপ। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহত ৪৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ছাড়া সবাই আবার নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু আকাশে বিমান উড়তে দেখলেই অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ হঠাৎ শব্দ শুনে চমকে ওঠে, আবার স্কুল ছুটির সময় ঘনিয়ে এলে অনেকের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়।
শিক্ষকদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের মানসিক পুনর্বাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত কাউন্সেলিং, মনোসামাজিক সহায়তা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবুও অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ট্রমার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনও স্পষ্ট। চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনার মানসিক অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অভিভাবকদের মনেও এখনও সেই দিনের ভয় কাজ করে। সন্তান স্কুলে গেলে অনেকেই উদ্বেগে থাকেন। কোনো বিমান নিচু দিয়ে উড়ে গেলে কিংবা হঠাৎ উচ্চ শব্দ শুনলেই তাদের মনে ফিরে আসে সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানরা আবার পড়াশোনায় ফিরলেও তাদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
অন্যদিকে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এই এক বছর ছিল অসীম শোক, শূন্যতা ও অপেক্ষার। অনেক বাবা-মা এখনও মাঝেমধ্যে স্কুল প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন, যেন হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে আবারও ফিরে পাবেন। সন্তানের ব্যবহৃত বই, পোশাক কিংবা ছোট ছোট স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে ধরে তারা কাটিয়ে দিচ্ছেন প্রতিটি দিন। তাদের ভাষায়, সরকারি সহায়তা বা আর্থিক অনুদানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘটনার প্রকৃত বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, এক বছর পার হলেও এখনো অনেক প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর তারা পাননি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে চান। তাদের মতে, শুধু তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনার পর অন্তর্বর্তী সরকার নয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করে। প্রায় তিন মাস ধরে তদন্ত শেষে কমিশন ১৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ১৬৮টি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ৩৩ দফা সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন নীতিগত ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে প্রশিক্ষণ চলাকালে পরিস্থিতি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিমানটি স্কুল ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রাথমিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বরিশাল ও বগুড়া বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণের প্রস্তাবও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ঝুঁকি কমানো যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নির্মাণে রাজউকের বিল্ডিং কোড পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে পর্যাপ্ত সিঁড়ি ও জরুরি বহির্গমন পথের অভাবের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয় এবং হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জনসমাগমস্থলে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঝুঁকি থেকে যাবে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটি দুই দিনের স্মরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারত, এক মিনিট নীরবতা পালন এবং নিহতদের স্মরণে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের সুস্থতা ও মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো দেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকা, নগর পরিকল্পনা এবং ভবন নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে এই ট্র্যাজেডি। তারা বলছেন, তদন্ত কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগই ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত এখনো শুকায়নি। শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা, চলছে পাঠদান, কিন্তু তাদের চোখে-মুখে এখনও লুকিয়ে আছে সেই দিনের আতঙ্ক। আর যেসব পরিবার তাদের প্রিয় সন্তানকে চিরতরে হারিয়েছে, তাদের কাছে প্রতিটি ২১ জুলাই ফিরে আসে নতুন করে শোক, স্মৃতি আর অশ্রুর দিন হয়ে। এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়, বরং নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বের এক চিরন্তন স্মারক।