আফগানিস্তানে আকস্মিক বন্যা, নিহত ২০, নিখোঁজ শতাধিক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৭৪ বার
আফগানিস্তানে আকস্মিক বন্যা, নিহত ২০, নিখোঁজ শতাধিক

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নুরিস্তান প্রদেশে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ২০ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাতের পর সৃষ্ট এই আকস্মিক বন্যা মুহূর্তেই বহু জনপদ তছনছ করে দেয়। উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি ও প্লাবিত এলাকায় জীবিতদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, ধসে পড়া সড়ক এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

তালেবান সরকারের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সৃষ্ট এই বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুরিস্তান প্রদেশের রাজধানী পারুন এবং আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল। প্রবল স্রোতে অসংখ্য ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেসে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় অনেকেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পাননি। ফলে বহু মানুষ পানির স্রোতে নিখোঁজ হয়ে যান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ১০০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে পারুন শহরের মেয়র এবং তাঁর দুই দেহরক্ষীও রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। উদ্ধারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া বা পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া অনেকেরই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্রমেই কমে আসছে। ফলে উদ্ধার অভিযান শেষ হলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

বন্যায় আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন। তাঁদের অনেককে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নিকটবর্তী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্গম অঞ্চলে চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরুতর আহত কয়েকজনকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড় ধসে বহু সড়ক সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেতু ভেঙে যাওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উদ্ধারকারীরা অনেক স্থানে পায়ে হেঁটে কিংবা সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাতও উদ্ধার তৎপরতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয়ের সংকটও দেখা দিয়েছে। বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অথবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থাও কাজ শুরু করেছে। তবে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ত্রাণ বিতরণেও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফগানিস্তান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসায় অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নুরিস্তানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বন উজাড়ও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। পাহাড়ে পর্যাপ্ত বন না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচে নেমে আসে এবং মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। ফলে পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বন সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো করা সম্ভব হয়নি। অনেক এলাকা এখনো বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে কী পরিমাণ প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণে সময় লাগবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই বন্যায় কয়েকশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কৃষিজমি, গবাদিপশু ও স্থানীয় ব্যবসায়ও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নুরিস্তানের এই মর্মান্তিক বন্যা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বাস্তবতার কঠিন রূপ নিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com