প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলমান ছাত্র আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং সমাবেশ ভণ্ডুলের ঘটনায় দেশটির চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে সরকারের প্রতি শিক্ষার্থীদের দাবি ও উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তাঁরা গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারতের নতুন রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে রাজধানী দিল্লির যন্তর-মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে আন্দোলনকারীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন। এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২৮ জুন থেকে সামাজিক কর্মী সোনম ওয়াংচুকও আমরণ অনশন শুরু করেন। পরে তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন আন্দোলনকারীরা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঘোষণা করলে প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। অভিযোগ রয়েছে, কর্মসূচি ঘিরে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং বহু আন্দোলনকারী আহত হন। এই ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয় এবং বহু পরিচিত মুখ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান।
প্রবীণ অভিনেত্রী শাবানা আজমি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যন্তর-মন্তরে উপস্থিত হয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সংবিধান প্রদত্ত একটি মৌলিক অধিকার। তিনি উল্লেখ করেন, গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অহিংস আন্দোলনের ঐতিহ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশ্য কখনোই সহিংসতা সৃষ্টি করা নয়; বরং শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরা।
অভিনেতা ও নির্মাতা প্রকাশ রাজও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা এবং তাদের সঙ্গে সংলাপই সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান হতে পারে।
পাঞ্জাবি শিল্পী দিলজিৎ দোসাঞ্জ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি সরকারের প্রতি তরুণদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার আহ্বান জানান এবং মনে করিয়ে দেন, অতীতেও বিভিন্ন আন্দোলনে মত প্রকাশ করায় তাঁকে নানা সমালোচনা ও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবুও তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়াই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অভিনেতা রিতেশ দেশমুখ ও অভিনেত্রী জেনেলিয়া ডি’সুজা যৌথভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, দেশের তরুণরাই ভবিষ্যতের নির্মাতা এবং তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা লিখেছেন, যুবসমাজের সাহস, স্বপ্ন এবং দৃঢ়তাই একটি শক্তিশালী ও উন্নত দেশের ভিত্তি গড়ে তোলে।
অভিনেত্রী হুমা কুরেশি আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষের ওপর সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে চিত্রনাট্যকার সুতপা সিকদার লিখেছেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ পরিবারের সন্তান, যারা ন্যায়বিচারের আশায় রাজধানীতে এসেছেন। তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর পরিবর্তে কঠোর আচরণ করা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নির্মাতা ও অভিনেত্রী নন্দিতা দাস বলেন, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে এবং রাষ্ট্র সেই মত শোনার সুযোগ সৃষ্টি করে। তাঁর মতে, গঠনমূলক সমালোচনা এবং ভিন্নমতকে সম্মান জানানো একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
অভিনেত্রী ভূমি পেদনেকরও সহিংসতার বিরোধিতা করে শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে সোনি রাজদান, জিনাত আমান, অভয় দেওল, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ, ওমি বৈদ্য এবং সোনাক্ষী সিনহাসহ আরও অনেক তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
সোনাক্ষী সিনহা তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবি থেকে সরে আসেননি। তিনি তরুণদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাদের কণ্ঠস্বরকে সম্মান জানানো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হলেও আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, তাঁদের কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পরীক্ষা পরিচালনায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ এখন সময়ের দাবি।
চলমান এই আন্দোলন ইতোমধ্যে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবির পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগের ওপর।