প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত সতেরো বছর একটি দীর্ঘ অন্ধকার, দুঃশাসন ও ভয়ের রাজত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা, মৌলিক মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে নির্মমভাবে পদদলিত করা হয়েছিল। দীর্ঘ এই সময় ধরে দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে চরম দলীয়করণের মাধ্যমে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল এবং নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সংকীর্ণ স্বার্থকে দেশের সার্বিক স্বার্থের ওপর স্থান দেওয়া হয়েছিল। এই স্বৈরাচারী ও জনবিচ্ছিন্ন শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যখন দেশের আপামর মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, তখন ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান ও জনগণের তীব্র গণআন্দোলনের মুখে অবশেষে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের বিশিষ্ট সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উচ্চারণ করেছেন যে, সীমাহীন নির্যাতন, দুর্নীতি এবং ভোটাধিকার হরণে অতিষ্ঠ হয়েই দেশের সর্বস্তরের মানুষ গণতন্ত্র হত্যাকারী শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে চিরতরে বিতাড়িত করতে বাধ্য হয়েছে।
সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণবন্ত একটি মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিগত সরকারের বহুমুখী দুর্নীতি এবং দেশের অর্থনীতির ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র অত্যন্ত সাবলীল ও স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন। চৌদ্দগ্রাম বাজারস্থ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম হলে আয়োজিত এই জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সম্মানিত সভাপতি মো. কামরুল হুদা। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চোসীন ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হারুন অর রশিদ মজুমদার এবং সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম রাজু। পৌর বিএনপির সভাপতি জিএম তাহের পলাশীর সুযোগ্য সভাপতিত্বে এবং উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. গিয়াস উদ্দিনের অত্যন্ত সুনিপুণ ও গতিশীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে চৌদ্দগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন স্তরের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন এবং দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দিকনির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি খাত তথা বিদ্যুৎ খাত এবং স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের ট্যাক্সে গড়ে ওঠা জাতীয় অর্থনীতির মূল কাঠামোকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে এবং ভিন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে এই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে আরও অভিযোগ করেন যে, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে, যার ফলে দেশের অর্থনীতি আজ এক গভীর ও অপূরণীয় সংকটের মুখে পতিত হয়েছে। বিগত সতেরো বছর ধরে কেবল ক্ষমতার মোহে অন্ধ একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সীমাহীন লালসা ও লোভের কারণে এ দেশের সাধারণ মানুষ চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যা কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজে কল্পনাও করা যায় না।
সৈরাচারী সরকারের শাসনপদ্ধতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে, তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে জোর যার মুল্লুক তার—এমন একটি বলাইর রাজ্য কায়েম করা হয়েছিল, যেখানে আইনের শাসন বা ন্যায়বিচারের কোনো বালাই ছিল না। দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও প্রশাসনের একটি অংশের বেপরোয়া অত্যাচারে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছিল এবং মানুষের মতো সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিবেশটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল, যাতে এ দেশের যুবসমাজ ও আগামী প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের শাসন ও শোষণের স্বরূপ বুঝতে না পারে। দেশের মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস যেন চিরতরে হারিয়ে ফেলে এবং কোনো অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করলে যাতে ভয়ে থমকে যায়, সেই ভয়ের সংস্কৃতি পুরো জাতির মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল দীর্ঘ সময় ধরে, যা আজ জনগণের জাগরণে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
একটি দেশের নাগরিক হিসেবে ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বেদনা ও বঞ্চনার ইতিহাস প্রকাশ করে তিনি বলেন যে, মানুষের সহনশীলতার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে এবং সেই সীমা যখন চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘিত হয়, তখন আর কেউ ঘরে বসে থাকে না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং গণতন্ত্র হরণের চরম পরিণতি হিসেবে দেশের ছাত্র-জনতা ও মুক্তিকামী মানুষ একাত্তরের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে রাজপথে নেমে আসে। জনগণের এই টুটে যাওয়া ধৈর্যের বাঁধ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অদম্য আন্দোলনের মুখেই শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী হাসিনাকে মসনদ ছেড়ে দেশ থেকে পালাতে হয়েছে এবং জনগণ বহু কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছে। এই বিজয় কেবল কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং উপস্থিত নেতাকর্মীদের আগামী দিনেও দেশের গণতন্ত্র রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
উক্ত মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রিত অন্যান্য বক্তারাও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন মামুন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের আহ্বায়ক খোরশেদ আলম, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক মো. হাসান, পৌর স্বেচ্ছাসেবকদলের আহ্বায়ক ইছহাক বেপারী এবং উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফখরুল হাসানসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ। বক্তারা বিগত দিনে দলের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো মিথ্যা মামলা, হামলা ও পুলিশি নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানান এবং একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় চৌদ্দগ্রামের এই রাজনৈতিক জমায়েত স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে এক নতুন রাজনৈতিক উদ্দীপনা ও প্রেরণা জুগিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।