প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষায় এক নতুন ও কঠোর সফলতার দেখা মিলেছে। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের পক্ষ থেকে অবৈধভাবে বেশ কয়েকজন নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের সুপরিকল্পিত ও গোপন একটি অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির অত্যন্ত সময়োপযোগী, কঠোর ও দৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে বিএসএফের সেই অবৈধ অপচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার ভোরে সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির পেশাদারিত্ব এবং সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পর সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে যেমন একধরনের নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি ফিরে এসেছে, তেমনি কূটনৈতিক ও সীমান্ত নিরাপত্তার গুরুত্ব নতুন করে সামনে চলে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায় যে, শুক্রবারে যখন ভোরের প্রথম আলো পুরোপুরি ফোটেনি এবং চারপাশ কুয়াশাচ্ছন্ন ও শান্ত ছিল, ঠিক সেই রাত আনুমানিক চারটার দিকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার অত্যন্ত সংবেদনশীল ধলা সীমান্ত এলাকায় এক অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকা অর্থাৎ ৪৭ বিজিবির আওতাধীন ধলা বিওপির সীমান্তবর্তী পিলার ১৩৫/৪-এস থেকে আনুমানিক দেড়শো গজ ভারতের অভ্যন্তরে ধলা মাঠ নামক নির্দিষ্ট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অর্থাৎ বিএসএফের ১১ ব্যাটালিয়নের বুড়িপোতা ক্যাম্পের সদস্যরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় চারজন পুরুষ এবং একজন নারীকে জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বেআইনিভাবে বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। গভীর রাতের নীরবতাকে কাজে লাগিয়ে এই ধরনের পুশইনের অপচেষ্টা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এবং সুসম্পর্কের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

তবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের টহলরত সদস্যরা আগে থেকেই অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। ধলা বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার নায়েক সুবেদার নিজাম উদ্দীন শিকদারের সরাসরি দিকনির্দেশনায় এবং টহল দলের সুদৃঢ় অবস্থানের কারণে বিএসএফের এই গোপন অপচেষ্টা খুব দ্রুতই ধরা পড়ে যায়। বিজিবির চৌকস সদস্যরা কোনো প্রকার শৈথিল্য না দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে সীমান্ত রেখার দিকে এগিয়ে যান। বিজিবির এই আপসহীন ও প্রতিরোধমূলক অবস্থানের মুখে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় ওই পাঁচজন ব্যক্তিকে পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে তারা বাধ্য হন। বিজিবির এই দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কারণেই বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কিংবা সীমান্ত লঙ্ঘন এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এই বিষয়ে কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়ন বা ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি সংবাদ মাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়েছেন যে, সীমান্ত এলাকার অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে বিজিবি সর্বদা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, দেশের সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন কখনোই বরদাস্ত করা হবে না এবং তা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বোচ্চ শক্তি ও পেশাদারিত্ব প্রয়োগ করতে প্রস্তুত রয়েছে। ধলা ক্যাম্পের কমান্ডার নায়েক সুবেদার নিজাম উদ্দীন শিকদারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী প্রতিটি পয়েন্টে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত টহল কার্যক্রম বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রতিটি সদস্য দিনরাত সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন।
সীমান্তবর্তী স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারাও বিজিবির এই বীরত্বপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান যে, রাতের অন্ধকারে এই ধরনের পুশইন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারত। সীমান্তবর্তী এলাকার গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষ এখন বিজিবির এই দৃঢ় ভূমিকার প্রশংসা করার পাশাপাশি নিজেরাও সীমান্ত রক্ষায় প্রহরী হিসেবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এলাকাবাসী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, অবৈধভাবে কাউকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং এ বিষয়ে তারা সর্বাত্মকভাবে বিজিবির পাশে থেকে যৌথভাবে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এই ধরনের পুশইনের চেষ্টা নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবির এমন কঠোর ও ত্বরিত প্রতিরোধ বাহিনীর সক্ষমতা ও দেশের প্রতি তাদের অগাধ দায়িত্ববোধের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধলা সীমান্তের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, দেশের সীমান্তরক্ষীরা ঘুমিয়ে নেই এবং যেকোনো পরাশক্তি বা অনৈতিক প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তারা বুক চিতিয়ে লড়তে প্রস্তুত। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে বলে দেশবাসী আশা প্রকাশ করছে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানা সুরক্ষায় এমন পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেম প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করে দেয়।